২৪শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

চোখে দেখাঃ সরকারী মাল- দড়িয়ামে ঢাল

অতি ছোট মানুষের জীবনেও কিছু ঘটনা বা অতীত জাতির জন্য শিক্ষা র কিছু আছে বা থাকে ! মনে আছে সেই ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকারের কথা ? ১/ ১১ মানে সরকারি কর্মকর্তা কমচারী একটা নিয়মে চলে আসা । যারা একটু  টু’পাইস ইনকামের ধান্ধা করতো সবাই সাবধান চলতে শুরু করলো । আমি তখন বায়োকেমিস্ট বিভাগে কর্মরত ।

আমাদের একটা টেস্ট হতো  নাম সিরাম ইলেক্টোলাইট। একটু ভেঙে বলি, ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে সোডিয়াম বের হয় তখন চিকিৎসকরা এই টেস্ট করাতে দেন। তাছাড়া রক্তে ইলোক্টোলাইট ব্যালেন্স ঠিক আছে কিনা তা দেখার জন্য বিভিন্ন কারনে চিকিৎসকরা এই টেস্টটি দিয়ে থাকেন। এটা খুব দামি ও জরুরি একটা পরিক্ষা। মেশিন টা তখন শুধু বরিশাল মেডিকেল কলেজেই ছিল, আর দু একটা বেসরকারি ডায়াগনষ্টিকেও ছিল। সরকারি রেট ছিল ২৫০ টাকা, বাহিরের ক্লিনিক নিত ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা ।

একটি বাচ্চা বয়স ৬ বছর হবে, ভোলা থেকে আসে কিডনি ফেল সমস্ত শরীর ফুলে নাক মুখ ফোলা । আমি বললাম বাবা ফ্রি করার অনুমতি কাগজ লাগবে। বাচ্চাটির বাবা অশিক্ষিত রিকশা চালায়। কিভাবে ফ্রি কাগজ আনতে হবে আমি সব বলে দিলাম।

কিন্তু দু দিন ঘুড়েও সে কাগজ আনতে পারে নাই । কারন সে কার কাছে যাবে বা কে স্বাক্ষর করবে তা কেউ পরিস্কার তাকে কেউ বলে না। তারপর দেখি কলেজের সিড়ির গোড়ায় মা ছেলে কাদছে । আমি বললাম কি হইছে বলে বাবা কাগজে কেউ ফ্রি লিখে না, সবাই বলে আপনি গরিব তা আপনার চেয়ারম্যান সাটিফিকেট আনতে হবে। এখন ভোলা যামু কেমনে হাতে টাকা নাই থাকলে তো বাহিরে বা আপনার এখানে ২৫০ টাকা দিয়ে রশিদ কেটে টেস্ট করাতে পারতাম। তারপর তাদের চোখে পানি আমি কেদে ফেললাম। ভাবলাম কার জন্য আইন ?

আমি তার কোলে করে বাচ্চাটি নিয়ে টেস্ট করে দিলাম ফ্রি তে আর বললাম বাবা কাগজ ছাড়া করা ঠিক না, আমি পরে নিজে কাগজ টি পাস করালাম, যেটা আমার করার কথা না।

যাক অন্য প্রসঙ্গে আসি, সিরাম ইলোক্টোলাইট মেশিন টি ২৪ ঘন্টা চালু রাখতে হয় টেস্ট হউক আর না হউক সে তার খাবার খাবে মানে রিজেন্ট শেষ করবে। মেশিনটি ভাল রাখতে হলে বন্ধ রাখা যাবে না ২৪ ঘন্টা চালু রাখতে হবে। মেশিনটির দাম ভাল কম্পানির হিউম্যান প্রায় ৩ লাখের বেশি আর ভিতরে যে ঔষধ থাকে তা দাম ১০০/৫০ টেস্টর জন্য ১৫০০০ টাকা থেকে ২৫০০০ টাকা হয়। এখন আমার মেশিনের ঔষধ শেষ, মেশিন বন্ধ রাখা যাবে না ।

আমার বিভাগের প্রধান চিঠি দেয় অধক্ষ্য মহোদয় কে । তখন অধক্ষ্য ছিলেন ডা আজিজ রহিম। আমি দেখা করলাম অনুরোধ করলাম স্যার রিজেন্ট না হলে মেশিন টি নস্ট হয়ে যাবে। সে এক কথা নস্ট হলে করার কিছু নাই রিজেন্ট কেনার টেন্ডার হবে তারপর । তারআগে আমি কিনতে পারবো না । তাইলে অডিট আপত্তি খাবো। আমি চুপ করে চলে আসলাম, মেশিন বন্ধ। সরকারি মাল নস্ট হলে কার কি?

কিছুদিন পর মহাখালী টেমো তে পাঠানো হলো মেশিন টি।  নিয়ে তারা বললো এটা ঠিক করা র চেয়ে নতুন মেশিন কেনা ভাল, কারন এটা ঠিক করতে ১ লাখ টাকা খরচ আবার ভাল রিপোর্ট দিবে না। তারপর চলে আসলাম মেশিন টি নিয়ে, চিন্তা করলাম মাত্র ১৫০০০ টাকার জন এত টাকার মেশিন টি নস্ট হল । তারপর কত গরিব মানুষ চিকিৎসা পেল না, এই দায় কার? এভাবে কত মেশিন হাসপাতালে সঠিক সময় মেরামত বা ঔষধ এর অভাবে নস্ট হয় ! আবার বরাদ্দ হয় নতুন মেশিন। হরিলুট করে খায় আমাদের প্রভাবশালীরা!

এখন থেকে যে কোন যন্ত্রপাতি কিনতে হলে আগে দেখতে হবে:- ১. যন্ত্রপাতি কে চালাবে তার দক্ষতা আছে কিনা । ২.এই হাসপাতালে তার পোস্ট আছে কিনা বা কতজন আছে, বা কতদিন সে থাকবে । ৩. যে কোম্পানি মেশিনটি দিবে কমপক্ষে পাচবছর বিনা পয়সায় সাভিসিং করে দিতে হবে এবং সকল রিজেন্ট তাদের কিনে দিতে হবে। কোন কারনে নস্ট হলে তাদের কে রিপ্লেস করে দিতে হবে ৪. অবশ্য ই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে।

লেখক: তাহেরুল ইসলাম সুমন

সাধারণ সম্পাদক,

বঙ্গবন্ধু টেকনোলজিস্ট পরিষদ, বরিশাল জেলা।

Print Friendly, PDF & Email

শেয়ার করুনঃ

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

সর্বশেষ