১৩ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়েও পদে পদে নিগৃহীত চিকিৎসকরা

শেয়ার করুনঃ

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

বাণী ডেস্ক:

‘স্যার, আমি জানি, আপনি বিশ্ববিখ্যাত একজন বিজ্ঞানী, আসুন একটু মুখোমুখি বসি।’
বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকে কুইজ কনটেস্টের জন্য ইনভাইট করে বসলো এক যুবক।
ওয়াও! খুব মজা পেলো আইনস্টাইন।
স্যার, আমাকে আপনি প্রশ্ন করবেন, যদি না পারি ১০ ডলার দিবো।
আপনাকে আমি প্রশ্ন করবো, যদি না পারেন আপনি ১০০ ডলার দিবেন। আপনি তো সবই পারেন, এজন্য এমন নিয়ম করলাম।
মুচকি হাসি দিয়ে মেনে নিলেন মি. আইনস্টাইন।
স্যার, আপনি প্রথমে প্রশ্ন করেন।
আচ্ছা বলতো E=Mc2, এটা কিসের সূত্র?
যুবক হা করে তাকিয়ে থেকে ১০ ডলার এগিয়ে দিল।
বাহ্, ছেলেতো সহজসরল ও সৎ! আচ্ছা, এবার তুমি প্রশ্ন করো।
কোন প্রাণী তিন পায়ে পাহাড়ে উঠে এবং দুই পায়ে নেমে আসে? প্রশ্ন করলো যুবক।
আইনস্টাইন অবাক হয়ে গেলেন, এমন কথা তো জীবনে শুনিনি! কি আর করা
১০০ ডলার এগিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করলেন আমি তো পারলাম না, এবার তুমিই বলে দাও উত্তরটা।
যুবক মুচকি হেসে ১০ ডলার এগিয়ে দিতে দিতে বললো স্যার, আসলে উত্তরটা আমারও জানা নেই।
জোকস্ টির যুবক বাঙালি না হলেও লেখক যে চালাক বাঙালি—এ ব্যপারে কোনো সন্দেহ নাই।
ভাবতেই ভালো লাগে। কত্তো কিউট বুদ্ধিমান জাতি আমরা। আসুন, আনন্দে এককাপ কফি খাই।
শকে থাকা মুমূর্ষু রোগী দেখে যখন মনের দুঃখে রোগীর স্বামী খোকন সাহাকে আচ্ছামতো গালাগালি করলাম, তখন স্বামী বেচারা আমাকে ধরে হাউমাউ করে কান্নাকাটি করলেন।
পালস্, প্রেসার জিরো, বাঁচার সম্ভাবনা কম শোনার পরও খোকন সাহার ক্ষমাপ্রার্থনা, কি করবো ডাক্তার বাবু, গরিব মানুষ, অটো চালিয়ে কতো টাকাই বা পাই, চিকিৎসা করাবো কি দিয়ে?
এই তিন দিন এক পল্লী চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়েছি।
খোকন সাহার স্ত্রী বাঁচেনি। ভর্তি করনোর পরপরই মারা গেছে। লাশ নিয়ে বাড়িতে চলে গেছে খোকন সাহা। পর দিন সকাল বেলা ফেসবুকে গালাগালির ফোয়ারা, ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু।
দু’দিন পর মামলা হয়েছে। অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার মামলা। আমি, কর্তব্যরত চিকিৎসক সীমান্ত কর্মকার আর ব্যবস্থাপক আশিকের নামে। দেড় দেড়টা বছর মামলায় হাজিরা দিয়েছি।
দেড় বছর পর একদিন নগ্নপায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত কামড়াচ্ছি আর নিজের কানে শুনছি আমার ‘নিজের করা কুকীর্তির’ কথা।
বাদীপক্ষের উকিল হলভর্তি মানুষের সামনে কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলছেন, মাননীয় আদালত, আমরা রোগাক্রান্ত হয়ে নিতান্ত অসহায় অবস্থায় ডাক্তারদের কাছে যাই। সেই ডাক্তাররা যদি অবহেলা করে, ভুল চিকিৎসা দেয় আমরা যাবো কোথায়? মাননীয় আদালত, আমার মক্কেল খোকন সাহার ছোটছোট বাচ্চাগুলোর দিকে তাকানো যায় না। রুমাল দিয়ে চোখ মুছেন উকিল সাহেব।

এবার আমি নিজেই জাজ সাহেবের অনুমতিক্রমে বলা শুরু করলাম …

মাননীয় আদালত, আপনাকে অনুরোধ করবো আমার দেওয়া প্রেসক্রিপশনের দিকে তাকাতে। প্রেসক্রিপশনের বা পাশে রোগীর ফাইন্ডিংস লেখা Pulse, BP non recordable. মানে আমি যখন দেখি তখন রোগীর পালস্ ও প্রেশার পাওয়া যায়নি। তার মানে রোগীর শেষ অবস্থা। তার তখন ঊর্ধ্বশ্বাস উঠা।
আপনার কাছে জানতে চাই, এই রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা কতটুকু? এই রোগীকে বাঁচানোর জন্যে কি কোনো চেষ্টাই আমরা করবো না?
আমি চিকিৎসা দেয়ার অল্পক্ষণের মধ্যেই রোগী মারা যায়। এখানে আমার অবহেলা করার সুযোগ কোথায়?
রোগীকে যখন কোলে করে এক্সামিনেশন বেডে শোয়ানো হয়, চেয়ারে বসা রোগীর অর্ধেক প্রেসার মাপা বাদ দিয়ে আমি তাকে এটেন্ড করি। তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে ভিজিটটা পর্যন্ত রাখিনি; বললাম, আগে রোগীর চিকিৎসা শুরু করেন পরে নেওয়া যাবে।
এই অবস্থায় আপনিই বলে দিন আমার কি করণীয় ছিল?
পুরো হলরুমে তখন পিনপতন নীরবতা। জাজ সাহেব বললেন, এই মামলা আর চলতে পারে না।
কি ভাবছেন? মামলা শেষ? নাহ্, বাদীপক্ষের উকিল এই মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) নিয়ে গেলেন!
আঁখিকে কুমিল্লার একটি হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারির জন্য ট্রায়াল দেওয়া হয়েছিল। সিজার লাগবে বলাতে ওরা ঢাকায় নিয়ে যায়।
সেন্ট্রাল হাসপাতালে আঁখির স্বামী কুমিল্লায় ট্রায়ালের তথ্য গোপন করেন। তাই আবারও তাকে ট্রায়াল দেওয়া হয়। এক সময় তার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলে এপিসিওটমি তথা সাইড সিজার করে। রোগী শকে চলে যায়। দুঃখজনকভাবে আঁখি আর বাঁচেনি। বাঁচেনি তার সন্তানও।
তদন্ত প্রয়োজন। দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি অবশ্যই প্রয়োজন।
তবে শুরুতেই সবাইকে হ্যান্ডকাফ লাগানো দুঃখজনক। যিনি রোগীকে বাঁচানোর জন্য পাশের ওটি থেকে দৌড়ে এসেছেন, তাকেও কারাগারে পুরে দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।
সঠিক বিচারের প্রত্যাশায় দিন গুনছি। ফিরে আসুক চিকিৎসার সুস্থ পরিবেশ।

ডা. তাইফুর রহমান
কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি
জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।

সর্বশেষ