১লা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

ঝালকাঠিতে গ্রামীণ জনপদে বর্ষার শেষে শরতে চলছে মাছ ধরার উৎসব

ঝালকাঠি প্রতিনিধি–
বর্ষা শেষে এসেছে শরৎকাল। কমছে ধানক্ষেতের পানি। তীরে থাকা কাঁশবনে দক্ষিণের হাল্কা বাতাস দোলা দিচ্ছে কাঁশফুলের মাথায়। খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর, কুপ, জলাশয় ডোবার পানিতে আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছ। সেই সঙ্গে ঝালকাঠি জেলার বিভিন্ন গ্রামেগঞ্জে মাছ ধরার ধুম পড়েছে। প্রতিটি গ্রাম গঞ্জেই এখন মাছ ধরার উৎসব চলছে। ভোর হতে না হতেই শুরু হয় মাছ ধরার পালা। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠে। সকলেই সরঞ্জামাদি নিয়ে এবং শিশু-কিশোররা খালি হাতেই মাছ ধরতে নেমে পড়ে। যেখানে হাঁটু পানি সেখানে সেচের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর মৎস্য শিকারিরা মাছের আশ্রয়স্থলে নামছে। দুপুর পর্যন্ত চলে মাছ ধরার এই প্রক্রিয়া। পরে নিজেদের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত মাছ হাটবাজারে বিক্রি করে দেয়। এ শরৎ মৌসুমেই গ্রাম গঞ্জে মাছ ধরার এই চিত্র চোখে পড়ে। আর মাছ ধরায় শামিল হতে পেরে শিশু-কিশোরদের আনন্দ আর আনন্দ। কাদা-পানিতে সারা শরীর মাখামাখি করে তারা মাছ ধরার আনন্দে বিভোর থাকে। কই, শিং, মাগুর প্রভৃতি দেশি জাতের জিয়ল মাছই ধরা পড়ে বেশি। তাছাড়া টেংরা, পুঁটি, খইলসা, শোল, টাকি, বোয়াল, চিংড়ি, বাইন, কাতলা, সিলভার কার্প প্রভৃতি মাছ তো রয়েছেই। বর্ষাকালে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে অতিরিক্ত পানি বৃদ্ধি এবং তারপরেও উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠিতে মাত্রাতিরিক্ত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফিশারিসহ বিভিন্ন ঘেরে চাষকৃত মাছ ভেসে গিয়ে ডোবা-পুকুর, খাল-বিল এবং নিচু জালাভূমিতে আশ্রয় নেয়। পরে শুকনো মৌসুমে সেইসব মাছ ধরা পড়ে। বর্তমানে গ্রাম গঞ্জের হাটবাজারে প্রচুর পরিমাণে দেশীয় মাছ পাওয়া যাচ্ছে এবং অন্যান্য সময়ের তুলনায় দামও এখন অনেক কম। এদিকে দ্বিতীয়বারে একই স্থান সেচ করে মাছ ধরায় ছোট-বড় কই, শিং, মাগুর, ভেদি, বায়লা, পাবদা, চিংড়িসহ দেশি মাছ শিকার দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রজনন না হওয়ায় ওই সব মাছের প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, দেশি কই, শিং, মাগুর, ভেদি, বায়লা, পাবদা, চিংড়ি ইত্যাদি মাছের প্রজননের সময় মা মাছেরা ডিম ছাড়ার জন্য বৃষ্টির পানিতে ভেসে গিয়ে ধান ক্ষেত, ডোবা, নালা, খাল-বিলে আশ্রয় নেয় এবং ডিম ছাড়ে। খাল, বিল, ডোবা, নালায় এখন ছোট বড় হরেক প্রজাতির দেশি মাছ বড় হয়ে ওঠার অপেক্ষায়। কিন্তু ছোট ছোট মাছসহ ডিম ওয়ালা মাছগুলো ধরে অহরহ বিক্রি করছে হাট-বাজারে। এতে নি¤œ আয়ের মানুষরা তিন বেলা পরিবারের খাওয়ার পরও এক থেকে দেড়শ টাকার মাছ বিক্রি করতে পারছেন। ঝালকাঠি মৎস্য সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামার ব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বর্ষাকালে জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁই দিয়ে মাছ ধরার হিড়িক চলতে দেখা গেছে। বাঁশ দিয়ে তৈরি ওই ফাঁদে মাছ একবার ঢুকে পড়লে আর বের হতে পারে না। উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার থেকে মৎস্য শিকারিরা বাঁশের তৈরি ওই বিশেষ ফাঁদ কিনে নিয়ে জমির রোপা ধানের ফাঁকে ফাঁকে এবং ছোট ছোট নালায় পেতে রাখেন এবং পাঁচ-ছয় ঘণ্টা পরপর ওই সব জায়গা থেকে ফাঁদ তুলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকার করা হয়। যে দিন বেশি বৃষ্টি হয় সেই দিন ওই চাইতে বেশি মাছ ধরা পড়ে। তবে মাছের ওই মরণফাঁদে ছোট ছোট বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পড়ায় মাছের প্রজনন সংকট দেখা দিচ্ছে । অপরদিকে একই স্থান একাধিকবার সেচ করার কারণেও মাছের বংশ বিস্তার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে দেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।

Print Friendly, PDF & Email

শেয়ার করুনঃ

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

সর্বশেষ