২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

বরিশালে অপার সম্ভাবনাময় আউটসোর্সিং

প্রিন্স তালুকদার ॥ করোনায় ত্রিশের দশকের মহামন্দার পর পুরো বিশ্ব আবারো অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে প্রায় সব দেশেই বেকারত্বের হার রেকর্ড ভাংছে। ইতিমধ্যে ইয়োরোপ থেকে দুই লাখের বেশি প্রবাসী ফিরে এসেছেন বাংলাদেশে, যাদের অনেকেরই চাকরি অনিশ্চিত অবস্থায় আছে। দেশের ভেতর কাজ হারিয়েছেন ইতিমধ্যে লক্ষাধিক তরুন-তরুনী, নর-নারী। পুরুষের পাশাপাশি নারী বেকারের সংখ্যা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। নারীরা কর্মহীন হলেও ঘরে ফিরে তাদের কাজ করতে হচ্ছে পারিশ্রমিকবিহীনভাবে। ফলে সদ্য বেকার হয়ে পড়া শিক্ষিত নারীরা হতাশায় জড়িয়ে যাচ্ছেন এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হচ্ছেন। তাই এই লক ডাউনে কিভাবে তারা কর্ম সংস্থান করতে পারেন এবং দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে পারেন তা নিয়ে ভাবতে হবে। কর্ম সংস্থান তৈরি এবং দক্ষতার উন্নয়নের অন্যতম একটি উপায় হতে পারে আউটসোর্সিং।

কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অধীনে না থেকে মুক্তভাবে কাজ করাকে ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্তপেশ বলে। আমরা কম বেশি শুনছি। অল্প বিস্তর বুঝেও ফেলেছি। কিন্তু বিষয়টা কি তাই? ফ্রিল্যান্সিং করে অনেকে লাখ লাখ অর্থ উপার্জন করলে আমরা বিষয়টিকে কেন যেন টাকার তুলনায় মূল্যায়ন করি। তবে ফ্রিল্যান্সিং এ দক্ষতা এবং ধৈর্য অন্যান্য পেশার চেয়ে বেশি। যারা ফ্রিল্যান্সিং করেন তাদেরকে ফ্রিল্যান্সার বা মুক্তপেশাজীবী বলা হয়ে থাকে।

১৮১৯ সালে ওয়েটার স্কট নামক এক লেখক ফ্রিল্যান্সিং শব্দটি ব্যবহার করেন। তখন অর্থের বিনিময়ে কাজ করা ব্যক্তিদের ফ্রিল্যান্সার বলা হতো। আধুনিক যুগে বেশির ভাগ মুক্তপেশার কাজগুলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। ফলে মুক্ত পেশাজীবীরা ঘরে বসেই তাদের কাজ করে উপার্জন করতে পারেন। এ পেশার মাধ্যমে অনেকে প্রচলিত চাকরি থেকে বেশি আয় করে থাকেন। ইন্টারনেটভিত্তিক কাজ হওয়াতে এ পেশার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি হাজারো ক্লায়েন্টের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং খাতে কাজ করছেন অনেক তরুণ। তাঁদের অনেকেই সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। অনলাইন মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্কের দক্ষ কর্মীদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। আয়ও করছেন ভালো। অনেকেই আবার নিজে কাজ করার পাশাপাশি অন্যকে কাজ শেখাচ্ছেন। হয়ে উঠছেন তথ্য প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা। কেউ কেউ প্রথাগত চাকরি ছেড়ে ফ্রিল্যান্সিংকেই বেছে নিয়েছেন পেশা হিসেবে। মুক্তপেশার কাজের পরিধি অনেক বেশি। বিশ্বব্যাপী এ ধরণের কর্মপদ্ধতির চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ফ্রিল্যান্সিং কাজ বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। যেমন- লেখালেখি ও অনুবাদ, সাংবাদিকতা, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডেভলপমেন্ট, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, ইন্টারনেট মার্কেটিং, গ্রাহক সেবা, প্রশাসনিক সহায়তা ইত্যাদি। ইন্টারনেটভিত্তিক মুক্তপেশার চর্চায় বিশ্বব্যপী বিভিন্ন ওয়েবসাইট তাদের সেবা বিস্তৃত করেছে এবং এসব মধ্যস্থ ব্যবসায়ীদের (মিডিয়া) মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী ক্রেতা এবং ভোক্তা উভয়েই। এসব ওয়েবসাইটে যে কেউ অ্যাকাউন্ট খুলে নিজেদের কাজের বিবরণ জানিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন। অপরপক্ষে যে কেউ অ্যাকাউন্ট খুলে বিজ্ঞাপিত কাজের জন্য উপযুক্ত মনে করলে আবেদন করেন। এদের উভয়ের মধ্যে লেনদেনকৃত পরিমাণ অর্থের একটা অনুপাত এ সকল মধ্যস্থ ব্যবসায়ী ওয়েবসাইটগুলো গ্রহণ করে। এটাই তাদের মুনাফা। অনলাইনভিত্তিক এরকম কয়েকটি জনপ্রিয় ওয়েবসাইটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আপওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সার ডট কম, ফাইভআরআর, গুরু ইত্যাদি। ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে যাঁরা একেবারে নতুন তাঁরা ভালোভাবে প্রোগ্রামিং শিখতে পারেন সবার আগে। এতে আউটসোর্সিংয়ে আমাদের দেশে অনেক উচ্চতর পর্যায়ে কাজ আসবে। যে কাজই শিখতে চান না কেন, আগে ভালোভাবে আপনাকে শিখতে হবে। তারপর কাজ পাওয়ার চিন্তা করতে হবে। তবে বর্তমানে ওয়েব ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং, ওয়ার্ডপ্রেস থিম ডেভেলপমেন্ট, মুঠোফোন অ্যাপ তৈরি, লিড জেনারেশন, অ্যাডমিন সাপোর্ট, গ্রাহকসেবা, ইন্টারনেট রিসার্চ ও ডেটা অ্যানালাইসিস কাজগুলোর চাহিদা বেশি। সাধারণত ফ্রিল্যান্সারদের কাজের কোন সময়সীমা নেই। এর ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই। ক্লায়েন্টের সঙ্গে ফ্রিল্যান্সারেদের চুক্তির ওপর তা নির্ভর করবে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজের ক্ষেত্রে প্রায় সময় ফ্রিল্যান্সারকে রাতে কাজ করতে হতে পারে। তবে মনে রাখা জরুরি, যে কাজই করা হোক না কেন তা তা ভালো করে জেনে-বুঝে তারপর করতে হবে এবং ক্লায়েন্টের সঙ্গে সব সময় ভালো যোগাযোগ রাখতে হবে। আর এই বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে নতুন কাজে অনেক সাহায্য করবে। প্রথমেই জানা জরুরি যে ভাসা–ভাসা ধারণা বা দক্ষতা নিয়ে আপওয়ার্ক বা যেকোনো মার্কেটপ্লেসে অ্যাকাউন্ট খুলে কাজ পাওয়ার চিন্তা করলে হতাশ হতে হবে। অনেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে একজন মুক্ত পেশাজীবী (ফ্রিল্যান্সার) হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। যাঁদের কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ আছে, তাঁরা যথাযথ দক্ষ হয়ে ফ্রিল্যান্সিং ক্ষেত্রে কাজ করতে পারেন। ফ্রিল্যান্সিং একটু কম বয়সে শুরু করা ভালো, কারণ পড়াশোনার পাশাপাশি আপনি কাজ করতে পারবেন। তবে এ কাজে যথেষ্ট ধৈর্য থাকতে হবে। ওয়েব ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট এবং এর কারিগরি সেবায় কাজ করে একজন সফল ফ্রিল্যান্সার সুমন সাহা। দীর্ঘ দশ বছর পরিশ্রমের পর সফলতা এসে ধরা দিয়েছে তার হাতের মুঠোয়। যিনি এক সময় কম্পিউটার কেনার কথা ভাবতেই পারতেন না তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার প্রকৌশলী (বিএসসি) পাস করে আজ কাজ করছেন তথ্য প্রযুক্তি নিয়ে। তিনি একুশে টেলিভিশনকে বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিং বিষয়টার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো আপনাকে দক্ষ হতে হবে। বিভিন্ন চাকরিতে হয়ত কিছুটা দক্ষ না হলেও চলে যাবে কিন্তু এ ক্ষেত্রে দক্ষ না হলেও এ পেশায় কোনভাবেই টিকবেন না।’ দক্ষতার সঙ্গে এ কাজের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। সুমন বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিং এমন একটা ক্ষেত্র, এখানে আপনাকে ধৈর্য নিয়ে লেগে থাকতে হবে এবং আপনার শেখার ও জানার আগ্রহ থাকতে হবে। আমাদের দেশে যারা একবারে নতুন ফ্রিল্যান্সার, আমি মনে করি তাদের ধৈর্য অনেক কম। এই আউটসোর্সিং ক্ষেত্রে আপনাকে ক্লায়েন্টের কাজ সময়ানুযায়ী শেষ করতে হবে। তবেই সাফল্য ধরা দেবে। নতুনদের অনেকেই শুরুতে অনেক ভুল-ত্রুটি করে থাকেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ক্লায়েন্টের মনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বাজে ধারণাও তৈরি হয় যা আমাদের ফ্রিল্যান্সিং জগতে কিছুটা হলেও এর প্রভাব পরে। এ ত্রুটি যেন তারা কাটিয়ে উঠতে পারে এ জন্য চেষ্টা করছি। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের (ওআইআই) তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনলাইন শ্রমের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। দেশের প্রায় সাড়ে ছয় লাখ নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সারের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার নিয়মিত কাজ করছেন। জ্ঞানভিত্তিক আউটসোর্সিংয়ের কাজে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ২০১৭ সাল থেকে ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রজেক্ট’ (এলইডিপি) নামে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। এই প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক তরুণ নিজ উদ্যোগে ফ্রিল্যান্সার বা মুক্ত পেশাজীবী হিসেবে কাজ করছেন। করোনা মহামারীর কারণে ফ্রিল্যান্সিং কাজের ক্ষেত্রে ঝুঁকে পড়ছে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংস্থাগুলো ভার্চুয়াল ওয়ার্কপ্লেসে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় ও বাড়িতে বসে কাজের সুযোগ দেওয়ায় ফ্রিল্যান্স চাকরির চাহিদা বেড়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির পরে খরচ কমাতে অনেক প্রতিষ্ঠান স্থায়ী কর্মীকে সরিয়ে ফ্রিল্যান্স কর্মীর দিকে ঝুঁকবে। ইকোনোমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রিল্যান্স এবং প্রকল্প ভিত্তিক কাজের গিগ প্ল্যাটফর্ম ফ্লেক্সিং ইট জানিয়েছে গত এপ্রিল মাসে ফ্রিল্যান্স পদে চাকরির জন্য নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। এইচআর টেকনোলজি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান পিপলস্ট্রং পূর্বাভাস দিয়েছে, ইন্টারনেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আইটি, আইটিইএস, স্টার্টআপ, হসপিটালিটি ও কুইক সার্ভিস রেস্টুরেন্ট, রিটেইল, লজিস্টিকের মতো বিভিন্ন খাতে ২৫-৩০ ভাগ কর্মী ফ্রিল্যান্স পদে রূপান্তরিত হবে। মুক্তপেশাতে কাজ করতে হলে মূলত ৪টি বিষয় থাকা চাই। কাজের দক্ষতা, সুন্দর একটি প্রোফাইল উপযযুক্ত কভার লেটার এবং ইংরেজি দক্ষতা। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলে দক্ষতা। দক্ষতা ছাড়া কোনভাবেই কেউ এ পেশায় টিকে থাকতে পারবে না। সুন্দর একটি কভার লেটার তৈরি করতে হলেও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। কেননা ফ্রিল্যান্সার যে কাজগুলো জানেন সেগুলো প্রোফাইলে যোগ করবেন, কাজের পোর্টফোলিও যোগ করবেন। মুক্ত এ পেশাজীবী যে ঐ কাজের উপযুক্ত এটা তার প্রোফাইল দেখেই বুঝা যাবে। তারপর বিজ্ঞাপন অনুযায়ী কভার লেটার লিখতে হবে। বিভিন্ন চাকরির কভার লেটার বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। ইংরেজির ভাষাগত দক্ষতা থাকতে হবে। পাশাপাশি অবশ্যই দক্ষতা এবং ধৈর্য থাকতে হবে। করোনাকালে ফ্রিল্যান্সিং কাজের চাহিদা বেড়েছে। ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান। স্টিভ জবস ২০০৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ব্যবসায় বড় কাজগুলো কখনো একজন ব্যক্তি একা করেন না। ওই কাজগুলো দলবদ্ধভাবে করা হয়।’ একাই এক শ ধারণা থেকে পৃথিবী সরে এসেছে গত শতাব্দীতেই। তাই তো পুরো বিশ্বে আউটসোর্সিং পেশাজীবীদের বাজার তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশও আউটসোর্সিংয়ে ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিশ্বে আউটসোর্সিং তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশের প্রায় ছয় লাখের বেশি মানুষ আউটসোর্সিং কাজের সঙ্গে জড়িত। নির্দিষ্ট কিছু পেশার মানুষ বা প্রযুক্তিতে দক্ষ ব্যক্তিরা এই আউটসোর্সিং কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও দিনে দিনে বাড়ছে এর গ-ি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যক্তি পর্যন্ত সবাই এখন চটজলদি সমাধান খোঁজেন আউটসোর্সিংয়ে। করোনা মহামারিতে গোটা বিশ্বের ছোট, বড়, মাঝারি—সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের খরচের খাতা ছোট করে নিয়ে এসেছে। বরাদ্দকৃত বাজেটের যথাযথ ব্যবহার করতে চাইছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান। ফলে আউটসোর্সিং কাজের তালিকায় যুক্তে হচ্ছে নতুন নতুন কাজ। বিশেষ করে অ্যাকাউন্টিং টেকনিশিয়ান, এন্ট্রি লেভেল অ্যাকাউনট্যান্ট, অডিটরও আউটসোর্সিং কাজ করিয়ে নিচ্ছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কাগজ–কলমের সঙ্গে হিসাব-নিকাশ আর নিরীক্ষার যোগাযোগটাও কমে যাচ্ছে। সফটওয়্যারনির্ভর হিসাব বিভাগের দিকে নজর এখন সবার। প্রযুক্তিনির্ভর পেশাদার হিসাবরক্ষক তৈরিতে দেশেও এখন কাজ করছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে এন্ট্রি লেভেল অ্যাকাউন্টিংবিষয়ক পেশাদার দক্ষতা অর্জন করে ফ্রিল্যান্সিং খাতে আসার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর ভাষ্য, ‘সবকিছুই এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। অ্যাকাউন্টিং বিষয়টিও এখন প্রযুক্তিরই অংশ। আমাদের দেশে অ্যাকাউন্টিং টুলস ব্যবহার করার মতো দক্ষ জনবলের অভাব আছে। এ পেশার একটা চাহিদা তৈরি হয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকায় প্রযুক্তিনির্ভর অ্যাকাউন্টিং পেশা আগে থেকেই চালু আছে। ফোর্বসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রিল্যান্স বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ছে। বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোয় নতুন নতুন কাজের চাহিদা তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া করোনাকালে আপওয়ার্ক, ফাইভার ও ফ্রিল্যান্সার ডটকমের আয় বেড়ে গেছে। আপওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেইডেন ব্রাউন বলেন, ‘দূরবর্তী কাজ এবং আরও নমনীয় কাজের মডেলগুলোয় যে সাড়া পড়েছে, তা আমাদের পক্ষে কাজ করেছে। ৪৫ শতাংশ ব্যবস্থাপকেরা পূর্ণকালীন নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছেন। ৭২ শতাংশ পেশাদার ফ্রিল্যান্সারের ব্যবহারের হার বেড়ে গেছে। এখন প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের কাজের নমনীয়তার বিষয়গুলোয় গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আপওয়ার্কের ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। বরিশালে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ পেয়ে আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল তরুণদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। তবে গুণগত মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ও প্রতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অপ্রতুলতায় অনলাইনে আউটসোসিং-এ দক্ষ জনবলের ব্যাপক অভাব রয়েছে। এছাড়া আয়কৃত অর্থছাড়ে জটিলতা, চড়া মূল্যে ধীরগতির ইন্টারনেট, লোডশেডিংসহ নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তরুণরাই এগিয়ে নিচ্ছেন আউটসোর্সিং শিল্পকে। ‘সময় এখন তারুণ্যের, সময় এখন বাংলাদেশের’ স্লোগানে বরিশালে তরুণ আইটি উদ্যোক্তারা পেশাগত মর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতির পাশাপাশি পুলিশি হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া নারী ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আরো পৃষ্ঠপোষকতা ও অনলাইনে যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষার দাবি তুলেছেন বরিশালের ফ্রিল্যান্সাররা। আউটসোর্সিং খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, অনলাইন কাজে ‘ফ্রিল্যান্সার’ সরবরাহে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বিশ্বের মোট বাজারের ১৬ শতাংশ বাংলাদেশ দখল করতে পেরেছে। সবচেয়ে বেশি ‘শ্রমিক বা ফ্রিল্যান্সার’ সরবরাহ করে প্রথম অবস্থানে রয়েছে ভারত। তাদের দখলে ২৪ শতাংশ বাজার। জানা যায়, বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেসের মধ্যে অন্যতম আপওয়ার্কডটকম, ফাইভার, ফ্রিল্যান্সারডটকম। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা মূলত ডাটা এন্ট্রি ও এসইও, এসইএম, এসএমএমের কাজ বেশি করে থাকেন। এ ছাড়া ওয়েবসাইট ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, রাইটিং, গ্রাফিকস ডিজাইনসহ অন্যান্য কাজও করে থাকেন। আলোচনায় বক্তারা বলেন, অনলাইন আউটসোর্সিংয়ের একটি বৃহৎ ওয়েবসাইট আপওয়ার্কে নতুন করে কাজের আবেদনের সুযোগ পাচ্ছেন না বাংলাদেশিরা। লাখ লাখ বাংলাদেশি তরুণ অ্যাকাউন্ট খোলার পর অর্ডার নিয়ে ক্লায়েন্টকে কাজ বুঝিয়ে দিতে না পারায় ওয়েবসাইটি বাংলাদেশ থেকে নতুন অ্যাকাউন্ট অনুমোদন দিচ্ছে না। দেশে এখনো দক্ষ ফিল্যান্সারের অভাব রয়েছে। এজন্য ভালোমানের প্রশিক্ষণের দরকার। তাহলেই গড়ে উঠবে বিশ্বমানের যোগ্যতাসম্পন্ন ফ্রিল্যান্সার আর বৃদ্ধি পাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। তাই সরকারি নজরদারি ও পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি পেশাগত মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। নারী ফ্রিল্যান্সার সালমা আক্তার তিশা বলেন, ডিজিটাল বিশ্বের প্রতিযোগিতায় টিকে আমরাও আজ হয়েছি ডিজিটাল বাংলাদেশ। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভংগির পরিবর্তন হয় নি। একজন মেয়েও যে পরিবারের বাইরে না গিয়েও ঘরে বসেই কাজ করতে পারেন সে বিষয়ে আমাদের ধারণা এখনো পরিবর্তন হয় নি। বর্তমান সময়ে মেয়েরা যে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পারে তাও তারা দেখিয়ে দিয়েছে কাজের মাধ্যমে। মেয়েরা এখন নিজের সুবিধামত সময়ে কাজ করতে পারছে ঘরে বসেই। তারাও হচ্ছেন ফ্রিল্যান্সার, আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে হচ্ছেন স্বাবলম্বী। কিন্তু ইদানীং এক্ষেত্রেও নারী ফ্রিল্যান্সাররা যৌন হয়রানির শিকার। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। বরিশাল ফ্রিল্যান্সার ফাউন্ডেশনের সভাপাতি মাসুদ রানা বলেন, সরকার ফ্রিল্যান্সারদের উন্নয়নে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ নিলেও বরিশালে ফ্রিল্যান্সারদেও প্রতি পুলিশি হয়রানি প্রকট আকার ধারন করেছে। ফ্রিল্যান্সারদের পেশাগত মর্যাদা ও যথাযথ স্বীকৃতি প্রদানে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। সেভ দ্য প্লানেট’র চেয়ারম্যান মো: হাসান-উজ-জামান আকন জানান, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি এবং এই পেশায় যারা সফল হয়েছেন তাদের সঙ্গে নতুনদের একটা সেতুবন্ধন তৈরি করার উদ্দেশ্যে অনলাইনে যারা ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিংয়ের সাথে সম্পৃক্তদের নিয়ে ওয়ানডেক্স নামের একটি অনলাইন প্লাটর্ফমের মাধ্যমে বরিশালে ফ্রিল্যান্সারদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, আয়কৃত অর্থছাড়সহ বিদ্যমান সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সারদের পেশাগত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠায় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। বরিশালে আউটসোর্সিং করে জিরো থেকে হিরো হওয়া এক সালেহীনের গল্পঃ বরিশাল বগুরা রোড এলাকার বাসিন্দা সালেহীন সানী। যিনি পরিবারের তিন ভাই-বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েই বৈবাহিক জীবনে আবদ্ধ হন তিনি। একদিকে সংসারের বোঝা, অন্য দিকে নিজের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। ক্রমশই যেন সবকিছু অন্ধকারে। কিন্তু তার সেই স্বপ্নে পূরন হয় ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং দিয়ে। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে অর্থ উপার্জনে নেমে পড়েন তিনি। দেখেছেন সফলতার মুখও। এক সময়ের বেকার ও হতাশাগ্রস্থ জীবন নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সালেহীন প্রায় চার বছরে আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে ঘরে বসেই আয় করেছেন প্রায় ৬০ হাজার ইউএস ডলার। বাংলাদেশী ঢাকায় যার পরিমান প্রায় ৫০ লাখ টাকা। আর বর্তমানে আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে প্রতি মাসে তার আয় সর্বনি¤œ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, বিশে^র অন্যতম ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ফ্রিল্যান্সারে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সারের জায়গাটাও দখল করে নিয়েছেন তিনি। এসব করে শুধু অর্থ উপার্জনই নয়, তিনি সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন বিশেষ সম্মাননাও। অনলাইনে সেবা প্রদান ও ফ্রিল্যান্সিংএ সফলতা অর্জনে ২০১৮ সালে বিভাগীয় ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলায় তরুন উদ্ভাবক হিসেবে দ্বিতীয় ও জেলা পর্যায়ে একমাত্র সফল ও শ্রেষ্ঠ তরুন উদ্ভাবকের সম্মাননা পেয়েছেন সালেহীন সানী। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এ-টু-আই তাকে এই সম্মাননা প্রদান করেছেন। আর তাই এখন ফ্রিল্যান্সিং বা আউট সোর্সিংকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। শুধুমাত্র সালেহীন নয়, তার মত আরো অনেক শিক্ষিত বেকার যুব সমাজ এখন ঘরে বসেই ডিজিটাল বাংলাদেশের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আউটসোর্সিং করে অর্থ উপার্জন করছেন। আলাপকালে সালেহীন সানী বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর পরই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু তখনও লেখা পড়ার খরচ পরিবারের কাছ থেকেই নিতে হয়েছে। নিজের বৈবাহিক জীবনে চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিলো না। তাই ২০১৪ সালে বরিশালে আইটি প্রতিষ্ঠান সাতরং সিস্টেমস’র বিজ্ঞাপন দেখে তাদের কাছে ছুটে যাই। সেখানে আউটসোর্সিং এর ওপর তিন মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও আরো তিন মাস ইন্টার্নশিপ করেছি। তিনি বলেন, ‘মুলত ২০১৫ সালের মে মাস থেকে আমি অনলাইন মার্কেটপ্লেসে প্রফেশনাল আউটসোর্সিং এর কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত ইউএস, ইউকে, ইউএই, ফ্রান্স, জাপান সহ বিভিন্ন দেশের ৩০০টির বেশি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। যার মাধ্যমে গত প্রায় চার বছরে ৬০ হাজার মার্কিন ডলার আয় করেছি। এতে করে শুধুমাত্র আমার নিজের উপার্জনই নয়, বরং বিদেশ থেকে বাংলাদেশ অনেক রেমিটেন্সও পাচ্ছে। তিনি বলেন, “বর্তমানে আমার নিজের ‘বাংলাটেক সিস্টেম্স’ নামক একটি আইটি ট্রেনিং, ডিজাইন ও প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখানে ফ্রিল্যান্সিং এর কোর্স করানো হচ্ছে এবং বর্তমানে ২০ জন আউটসোর্সিংয়ের কাজ করছেন। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এরই মধ্যে ২৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে ফ্রিল্যান্সিং এর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। যার অনেকেই এখন আউটসোর্সিং করে হাজার হাজার টাকা উপার্জন করছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের ‘বরিশাল ফ্রিলান্সিং ফাউন্ডেশন ও অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটি’ রয়েছে। যার মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সারদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও সহযোগিতা করা হচ্ছে। সালেহীন বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের কারনেই আমি আমার স্বপ্নকে বাচিয়ে তুলতে পেরেছি। আমার স্বপ্ন পুরন হয়েছে। আমি নিজের পায়ে দাড়াতে সক্ষম হয়েছি। অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি লেখা পড়াও চালিয়ে যাচ্ছি। ফ্রিল্যান্সিংকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি বিধায় এ বিষয়ে আরো অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য অনলাইনে ওপেন ইউনিভার্সিটি ইউকে থেকে ডিসটেন্স লার্নিং কোর্স করছি। আমার স্ত্রীও বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। সেও ফ্রিল্যান্সিং এর ব্যাপারে ধারণা অর্জন করে আমার কাজে সহযোগিতা করছে। এদিকে সালেহীন সানিকে আউটসোর্সিং এর প্রশিক্ষণ দেয়া বেসরকারি আইটি প্রশিক্ষণ সেন্টার সাতরং সিস্টেমস’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আযাদ আলাউদ্দীন বলেন, ‘সালেহীন আমাদের থেকে ‘সন্ধ্যান যন্ত্র নিখুতকরণ’ (এসইও) প্রশিক্ষণ গ্রহন করেছে। এসইও আউটসোর্সিং জগতে জনপ্রিয়। বর্তমানে এ কাজের মাধ্যমে ভালো আয় করা যায়। তাই অনেক শিক্ষার্থী এবং চাকুরিজীবিরা তাদের কাজের পাশাপাশি এসইও কাজের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘২০১৪ নালের ১ জানুয়ারি থেকে আমাদের সাতরং সিস্টেমস’র কার্যক্রম শুরু হয়। এ পর্যন্ত আউটসোর্সিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন সহ ১৬টি কম্পিউটার কোর্সে ২৫০টি ব্যাচে মোট ২১১৫ জন প্রশিক্ষণ গ্রহন করেছেন। যার মধ্যে আউটসোর্সিং কোর্স করেছে প্রায় তিনশ জন এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনারের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ৩৬৭ জন। এরমধ্যে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী অনলাইন ও গ্রাফিক্স ডিজাইনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছে। যাদের মধ্যে সালেহীন সানী একজন। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মান ও বর্তমান সরকারের আইটি বিষয়ে ব্যাপকতার কারনেই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে আয়ের উৎস বেরিয়ে আসছে বলে মনে করেন তিনি। এদিকে শুধুমাত্র এই একটি প্রতিষ্ঠানই নয়, ‘দেশের ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে সরকারিভাবেও বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। যেখান থেকে আউটসোর্সিং সহ আইটি প্রশিক্ষণ নিয়ে আয়ের পথ বেছে নিচ্ছে যুব সমাজ। এ প্রসঙ্গে বরিশালের জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই। কেননা বাংলাদেশের শিক্ষিত যুবসমাজকে এখন আর বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে না। তারা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং করে অর্থ উপার্যন করতে পারছে। নিঃশন্দেহে এটি ভালো কাজ। এ কাজের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরী হচ্ছে, উদ্যোক্তা তৈরী হচ্ছে। আমরা এদেরকে উৎসাহিত করে থাকি। তাদের এই কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন সেতুবন্ধন তৈরী হয়েছে। পাশাপাশি এ প্রযুক্তিই এক সময় ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে সহায়ক ভুমিকা রাখবে। আরেকটা গল্পঃ ফেইসবুকেই যার রাত্রি পার হতো, সে একদিন বন্ধুর মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানতে পারলেন। বন্ধুর পরামর্শে ফ্রিল্যান্সিং ওয়ার্কপ্লেসে অ্যাকাউন্ট খুলে কাজ শুরু করলেন। এখন ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। অন্যদের গল্প একটু ভিন্ন হলেও প্রায় কাছাকাছি। তাদের কেউ শুরু করেছিলেন বড় ভাই বা সহকর্মীর কাছ থেকে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জেনে। শেষে দেখা গেল, সেই গল্পই পাল্টে দিয়েছে তাদের জীবন। হতাশাও দূর করেছে অনেকের। এখন তারা মাসে আয় করছেন দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে জীবন বদলে ফেলা এসব ফ্রিল্যান্সারদের সম্প্রতি বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে। জেলার সেরা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তারা। দেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটিই সর্বোচ্চ সন্মানজনক পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত। সফলদের সন্মানিত করার পাশাপাশি এ পেশাকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) ২০১১ সাল থেকে দিয়ে আসছে এ পুরস্কার। এ বছর আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৯৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পেয়েছে। এদের মধ্যে বরিশালের ২ ফ্রিল্যান্সারদের জীবন বদলে যাওয়ার গল্প তুলে ধরা হলো। আব্দুল মালেক, ভোলাঃ ভোলার সেরা চরফ্যাশন থানার মাঝেরচর গ্রামের ছেলে মালেক গণিতে মাস্টার্স করেছেন। চারপাশের অনেকের কাছে ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফলতার কথা শুনে এ বিষয়ে আগ্রহী হন। ২০১২ সালে সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করেন ফ্রিল্যান্সিং। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ওডেস্কে এসইও, এসইএম, এসএমএম, ইমেইল মার্কেটিং ও অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ের কাজ করেন মালেক। তবে অন পেইজ ও অফ পেইজ কিওয়ার্ড রিসার্চের কাজই বেশি করে থাকেন। ব্যক্তিগত ও দলগত উভয়ভাবে বর্তমানে কাজ করেন ভোলার এ তরুণ ফ্রিল্যান্সার। তাদের গ্রুপে মোট ৬ জন সদস্য রয়েছে। প্রতিমাসে গড়ে অর্ধলক্ষাধিক টাকা আয় করছেন তিনি। আগামীতে একটি মানসম্মত ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান চালু করতে ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রসার ঘটাতে কাজ করতে চান মালেক। মিজানুর রহমান, পটুয়াখালীঃ পটুয়াখালীর সেরা মিজানুর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাই তিনি কুমিল্লাতেই থাকেন। বিবিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন একদিন ফেইসবুকে এক বন্ধু মেসেজ দেয় ‘এত রাতে কি করছেন?’ মিজানুর চ্যাট করার কথা জানায়। তখন ওই বন্ধু তাকে ইল্যান্সের লিংক দিয়ে চাইলে সেখান থেকে আয় করার কথা জানান। তার পরামর্শে ইল্যান্সে একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন মিজানুর। ওয়েব ডিজাইন ও গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ পছন্দ হয়। তাই এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে কাজ শুরু করেন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে নেওয়ার জন্য কাজ করে চলেছেন। এখন অপেক্ষা শুধু বিবিএ শেষ করার। কাজের ওপর নির্ভর করে ব্যক্তিগত ও দলগতভাবে কাজ করেন মিজানুর। ওডেস্কে এ পর্যন্ত ১৮৮ ঘন্টা কাজ করেছেন। আর প্রতিমাসে গড়ে আয় করছেন প্রায় ৩০ হাজার টাকা। আগামীতে একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি।ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশ হচ্ছে অন্যতম শীর্ষ সফল দেশ। দেশের তরুণরা শুধু ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ঘুরিয়ে দিচ্ছে ভাগ্যের চাকা। বর্তমান সময়ে তরুণদের কাছে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ের একটি হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং। গতানুগতিক চাকুরীর বাইরে নিজের ইচ্ছামত কাজ করার স্বাধীনতা হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং। যদিও এখনও এ বিষয়টি নতুন, কিন্তু এরই মধ্যে অনেকে ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্যকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। পড়ালেখা শেষে বা পড়ালেখার সাথে সাথে ফ্রিল্যান্সিং এ গড়ে নেয়া যায় ভবিষ্যৎ প্রফেশনাল ক্যারিয়ার। ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে মাল্টি বিলিয়ন ডলারের একটা বিশাল বাজার। ইন্টারনেটের কল্যানে এখন খুব সহজেই একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারা যায়। ফ্রিলান্সিং সেক্টরে একদিকে যেরকম রয়েছে যখন ইচ্ছা তখন কাজ করার স্বাধীনতা, তেমনি রয়েছে বিভিন্নধরনের কাজ বাছাই করার স্বাধীনতা। আয়ের দিক থেকেও অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং এ রয়েছে অভাবনীয় সম্ভাবনা। এখানে প্রতি মূহুর্তে নতুন নতুন কাজ আসছে। প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, এসইও, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েবসাইট, গেম, এনিমেশন, প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, সফ্টওয়্যার বাগ টেস্টিং, ডাটা এন্ট্রি – এর যেকোন এক বা একাধিক ক্ষেত্রে সফলভাবে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে তৈরি করে নেয়া যায়। প্রফেশনাল ফ্রিলান্সার হতে গেলে ধৈর্যশীল এবং কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে। তাই এই দুটো বিষয়ে ছাড় দিয়ে সামনে আগাতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং নিদির্ষ্ট কোন কোর্স নয়। যে কোন একটি বিষয়ের উপরে সঠিক শিক্ষা (ট্রেনিং) নিয়ে ফ্রিলান্সিং করা যায়। সেক্ষেত্রে ভাল লাগার বিষয়টি পছন্দ করতে হবে। কারন, যে বিষয়ে আগ্রহ নেই সে বিষয়ে কখনই সফল হতে পারা যায় না। ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সুবাদে বরিশাল অঞ্চলে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং পেশা। দশ বছর আগেও বরিশাল অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ জানত না আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং কী। এখন সেই ফ্রিল্যান্সিং পেশাতেই ক্যারিয়ার গড়ছেন অনেকে। বরিশাল অঞ্চলের মানুষ আউটসোর্সিং সম্পর্কে প্রথম ধারণা পায় ২০১০ সালের পর সরকারের এটুআই প্রকল্পের মাধ্যমে। প্রাথমিকভাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে আয়োজিত আইটি-বিষয়ক সেমিনারগুলোর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা প্রথম আউটসোর্সিং সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। তখন অনেকের কাছেই বিষয়টি অলীক কল্পনা বলে মনে হতো। মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে এখন বরিশাল অঞ্চলে তৈরি হয়েছে অন্তত পাঁচ শতাধিক প্রফেশনাল ফ্রিল্যান্সার। যারা এখন ফ্যিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিংকেই তাদের একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তারা এখন বরিশাল অঞ্চলে অবস্থান করে বিভিন্ন দেশের বায়ারদের কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন, যা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বরিশাল অঞ্চলে। প্রথম দিকে বরিশাল অঞ্চলের ফ্রিল্যান্সাররা ইন্টারনেটের ধীরগতি, পেশাদার প্রশিক্ষণ সেন্টার না থাকা, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবসহ নানা সমস্যার মধ্যে কাজ করলেও এখন আর সেসব সমস্যা নেই। ইতোমধ্যে বরিশাল অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অনেক প্রফেশনাল আইটি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রফেশনাল ট্রেনিং পেয়ে অনেকেই আউটসোর্সিং বিষয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে সক্ষম হচ্ছেন। তা ছাড়া সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে চলছে একাধিক আইটি প্রশিক্ষণ কোর্স। শত শত শিক্ষার্থী ও বেকার যুবক এসব কোর্সে অংশগ্রহণ করে আউটসোর্সিং সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করতে পারছেন। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের আইসিটি ডিভিশনের অধীনে হাইটেক পার্ক প্রকল্পের আওতায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিংয়ে বরিশালে নিউজেন পরিচালনা করছে ২ডি এবং ৩ডি অ্যানিমেশন কোর্স, ডিভাইন আইটি পরিচালনা করছে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স, লিডস করপোরেশন ও আইবিসিএস প্রাইমেক্স পরিচালনা করছে ডিজিটাল মার্কেটিং কোর্স। এ ছাড়াও বরিশালে বেশ কয়েক বছর ধরে সেইফ ও শিপ আওয়ার প্রজেক্টের মাধ্যমে চলছে আইটির বিভিন্ন কোর্স। এসব কোর্সে অংশ নিয়ে আইটির বিভিন্ন বিষয় ও আউটসোর্সিং সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাচ্ছেন বরিশাল অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। বরিশাল বিএম কলেজের দু’টি কম্পিউটার ল্যাবে চলমান নিউজেন ও ডিভাইন আইটির বরিশালের কোর্স সমন্বয়ক যথাক্রমে আল আমিন ও তরিকুল ইসলাম জানান, এসব কোর্সে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের প্রথম তিন মাস বেসিক আইটি ও বেসিক ইংলিশ শেখানো হয়। এরপর আইটির নির্দিষ্ট বিষয়ে তাদেরকে দক্ষ করে তোলা হয়। এর মাধ্যমে তারা আউটসোর্সিং সম্পর্কেও সম্যক ধারণা আর্জন করতে পারছেন। সরকারি এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বরিশালে বেসরকারি উদ্যোগেও গড়ে উঠেছে একাধিক আইটি প্রতিষ্ঠান। তারাও আইটি ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি বরিশালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় আইটি প্রতিষ্ঠান সাতরং সিস্টেমস। একই বছরের ৯ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধন লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠানে আইটির বিভিন্ন বিষয়ে বর্তমানে ১৫টি কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। এসব কোর্স পরিচালনার জন্য ট্রেইনার রয়েছেন ২০ জন। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে কোর্স সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এদের মধ্যে আউটসোর্সিং কোর্স সম্পন্ন করেছেন প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী, যাদের অনেকেই এখন প্রতিষ্ঠিত ফ্রিল্যান্সার। সাতরং সিস্টেমসের চেয়ারম্যান মো: তারিকুল ইসলাম সিকদার বলেন, কারিগরি ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে মানসম্মত আইটি ট্রেনিং অব্যাহত রেখেছে সাতরং সিস্টেমস। বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী জুনায়েদ হোসেন ও বিএম কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে মাস্টার্স উত্তীর্ণ শাহনাজ ইভা জানান, তারা সাতরং সিস্টেমস থেকে আউটসোর্সিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রতি মাসে গড়ে ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। কাজের ধারাবাহিকতা থাকলে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হলে এই আয়ের পরিমাণ আরো বাড়বে বলে মনে করছেন তারা। সাতরং আইটি ট্রেনিংয়ের আউটসোসিংয়ের প্রশিক্ষক ও পেশাদার ফ্রিল্যান্সার মাসুদ রানা বলেন, এখানে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, এসইও, এসএমএম এবং গ্রাফিক বেইস আউটসোর্সিংসহ মার্কেট প্লেস বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর কাজ বিড করা থেকে কাজ পাওয়া, কাজ শেষ করে বায়ারদের অ্যাকাউন্টে আপলোড করা এবং সবশেষে উপার্জিত টাকা দেশে আনার পদ্ধতিও হাতেকলমে শেখানো হয়। সফলভাবে কোর্স সম্পন্নকারীদের আউটসোর্সিংয়ের কাজ পেতে সহায়তাও করা হয় এখানে। ইতোমধ্যে সাতরং আইটি ট্রেনিংয়ের বেশ কয়েজন শিক্ষার্থী আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে এখন বেশ ভালো আয় করছেন। সাতরং সিস্টেমস অফিস ঘুরে দেখা যায়, এখানে রয়েছে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎব্যবস্থা ও অত্যাধুনিক নেটওয়ার্ক-সমদ্ধ তিনটি কম্পিউটার ল্যাব। এসব ল্যাবে রয়েছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ও ওয়াফাই কানেকশনসহ ৩২টি কম্পিউটার, প্রতি ব্যাচে ভর্তি করানো হয় মাত্র ১০ জন ছাত্রছাত্রী। এ কারণে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীই পাচ্ছেন আলাদা কম্পিউটার ফ্যাসিলিটি। ভা-ারিয়া থেকে আসা স্কুলশিক্ষক সুকেশ ম-ল জানান, কয়েক বছর অগে আমি ভা-ারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি সেমিনার থেকে আউটসোর্সিং বিষয়ে প্রথম জানতে পারি। এরপর এ বিষয়ে আরো জানার জন্য খোঁজখবর নিয়ে বরিশালের আইটি প্রতিষ্ঠান সাতরং সিস্টেমস সম্পর্কে অবহিত হয়ে এখানে ভর্তি হই। এখানে প্রফেসনাল ট্রেইনারের মাধ্যমে কাজগুলো হাতে কলমে শিখতে পেরেছি। সাতরং সিস্টেমস থেকে আউটসোর্সিং বিষয়ে সফল ক্যারিয়ার অর্জনকারী সালেহীন সানী ও জিল্লুর রহমানসহ আরো কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী জানান, আউটসোর্সিং সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা অর্জন করে উপার্জন করতে হলে সাতরং সিস্টেমসের কোনো বিকল্প বরিশালে নেই। বরিশালের আইটি বিশেষজ্ঞ ও প্রফেশনাল অ্যাফিলিয়েট মার্কেটার মোহাম্মদ সিফাত বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আইটিতে দক্ষ জনবল তৈরির ব্যাপক কাজ চলছে বরিশাল অঞ্চলে। তবে সরকারি উদ্যোগে বেশিসংখ্যক মানুষ ফ্রি প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলেও সফলতার হার কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেশি। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডারের নানা বাধ্যবাধকতা, প্রশিক্ষণার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে তদবিরকে প্রাধান্য দেয়া, প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা কম্পিউটারের ব্যবস্থাসমৃদ্ধ কম্পিউটার ল্যাব না থাকাসহ নানা কারণে এসব ট্রেনিংয়ের কাক্সিক্ষত সফলতা আসছে না। এসব বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের ট্রেনিংয়ে আরো ভালো ফল এসিভ করা সম্ভব। এ জন্য ট্রেনিংয়ের তদারকি সংস্থাগুলোকে আরো সক্রিয় করতে হবে। বরিশালের তরুনরা বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারের এটুআই প্রকল্পের অধীনে সারা দেশের মতো বরিশালেও ব্যাপক কাজ হচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং কিংবা আউটসোর্সিংয়ে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাইটেক পার্কের আওতায় বরিশালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একাধিক প্রশিক্ষণ কোর্স ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, আরো বেশ কয়েকটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। তা ছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রফেশনাল আইটি কোর্স পরিচালনা করছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বরিশাল অঞ্চলে আরো বেশ কিছু প্রফেশনাল ফ্রিল্যান্সার তৈরি হবে।

Print Friendly, PDF & Email

শেয়ার করুনঃ

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

সর্বশেষ