১৭ই মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

বরিশালে নতুন ট্র্যাজেডি ! ত্রাণ নিয়ে ঘরে ফিরে তরুণীর আত্মহত্যা

শাকিব বিপ্লব:

বরিশালে অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর মিছিল যেনো বাড়ছেই। তৈরী হচ্ছে নিত্য-নতুন ট্রাজেডি। এবার এক কলেজ ছাত্রী প্রেম প্রতারনায় নিজের গলায় রশি ঝুলিয়ে আত্মাহুতি দিলেন। প্রথমে উত্তক্ত্য পরবর্তীতে প্রেমের গভীরতায় সম্পর্ক, সর্বশেষ বিয়েতে অস্বীকৃতি নিয়ে দ্বন্দে অষ্টাদশী তরুণী বৃষ্টি ঘোষ নামের এই করুণ মৃত্যু মানতে পারছে না তার পরিবার। অথচ এই আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী অমিত দাসের পরিবার বিষয়টি আমলে নিতে নারাজ। হাসপাতাল রোডের এই ঘটনা যেকোনো হৃদয় বা বিবেককে পীড়া দিলেও স্থানীয় অনেকেই তরুণীর বিয়োগান্ত বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চুপ রয়েছে এই পরিবারের আর্থিক দূর্বলতা ও বিপরীতে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা বিবেচনায়।
গত ২৩ মে রাতে এই কাহিনীর বিলম্বপ্রাপ্ত তথ্য পাওয়ার পর নেপথ্যের খবর জানতে গিয়ে পাওয়া গেলো ঐ সড়কে একটি রোমিও গ্রুপের আস্ফালন এবং স্থানীয়রা তা দেখেও প্রতিবাদ না করায় সর্বশেষ এই ঘটনার জন্ম নিতে সহায়ক হয়েছে। এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে বিভিন্ন ব্যাক্তিবিশেষের অভিমত থেকে।
স্থানীয় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র ও পুলিশের দাবী, মহাদেব ঘোষের কন্যা ৫ কন্যার মধ্যে ৪র্থ বৃষ্টি ঘোষ আত্মহত্যার কিছুক্ষণ পূর্বে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর উদ্যোগে ঐদিন রাত ২টায় অমৃত লাল দে কলেজে সম্মুখের দক্ষিণ পাশের সড়কে ঈদপূর্ব ত্রাণ বিতরণ করার প্রাক্কালে মাকে সাথে নিয়ে বাড়ির নিচে নেমে তা গ্রহণ করে হাসিমুখে ঘরে ফেরে। রাত শেষে ভোর সাড়ে ৬ টায় অর্থাৎ ২৪ মে সকালে মা পূর্ণিমা ঘোষ জেগে দেখেন বৃষ্টি বেডরুমের ফ্যানের হুকের সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলছে। এরপরই জানাজানি হয়ে যায় বরিশাল মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের মেধাবী ছাত্রী এই তরুনীর মৃত্যুর নেপথ্যে নাতিদীর্ঘ এক প্রেমকাহিনী।
অনতিদূরে ঝাউতলা গলির সম্মুখে রুহুল আমিনের ভাড়াটিয়া অমল দাসের পুত্র অমিত দাস নামক এক যুবক দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিকে উত্যক্ত করে আসছিলো। পরে ঘটনাচক্রে অমিতের প্রেম প্রস্তাব তরুনী মেনে নিয়ে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। দিন, এমনকি রাত-বেরাত বৃষ্টিকে তার মোটরবাইকে উঠিয়ে ঘোরাঘুরিতে তাদের প্রেম সম্পর্ক শুধূ স্থানীয়রা নয়, উভয় পরিবার এবিষয়ে অবগত ছিলো। প্রথমে উত্যক্ত করায় অমিত দাসের পিতা অমল দাসের কাছে বহু অভিযোগ দেওয়ায় দুই পরিবারের মাঝে তিক্ততার অবসান ঘটে একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেম সম্পর্ক গড়ে উঠলে। সেই সাথে পেছনের কথা ধামাচাঁপা পড়ে যায়।
হঠাৎ করে কেনো সে মৃত্যুর পথ বেছে নিলো ? এমন প্রশ্নের উত্তরে এই তরুনীর পরিবারের অভিযোগ ২৭ মে রাত ৩ টার দিকে বৃষ্টির সাথে অমিতের সেলফোনে কয়েক দফা তর্ক হয়। একপর্যায়ে অভিমান ভেঙ্গে বৃষ্টির প্রেমিক অমিতকে একাধিকবার ফোন দিলেও সাড়া দেয়নি। কিন্তু কী নিয়ে তাদের ফোনালাপে তর্কের সৃষ্টি হয়েছিলো তা আঁচ করতে পারেনি তরুনীর পরিবার। আত্মহত্যার পর দেখা গেছে বৃষ্টির মায়ের সেলফোনের মাধ্যমে কয়েক দফা তাদের মধ্যে কথা হয়। বৃষ্টির নিজের এনড্রয়েড সেলফোনে সর্বশেষ রাত তিনটার দিকে দুটি মিসকল দেখা যায় । সেলফোনটির লক থাকায় তা খোলা সম্ভব না হওয়ায় জানা যায়নি ঐ ফোনদাতা কে? পুলিশ ফোনদুটি জব্দ করেছে তদন্তের স্বার্থে।
হাসপাতাল রোডের অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের সামনের সড়ক অতিক্রম করে দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বিএম স্কুলে পৌছাঁনোর বাইপাস সড়কের মধ্যভাগে মঞ্জুআরা নিবাসের ৩য় তলায় বৃষ্টির পরিবার ভাড়াটিয়া হিসেবে বছরখানেক যাবৎ বসবাস করছেন। পুলিশের ধারনা , ঐ বাসায় সামনের রুমটিই ছিলো বৃষ্টির বেডরুম, ধারনা করা হচ্ছে, ঘটনার দিন ঘভির রাতেও এই যুবক ঐ বাসায় এসেছিল। নিহতের পরিবার ও পুলিশের অভিন্ন মন্তব্য, ৪ বছরের প্রেমের গভীরতার শেষ টানতে বৃষ্টি  অমিতকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান করায় ঐ রাতে সম্পর্কের অবসান টানতে অমিত আল্টিমেটাম দেওয়ায় অতীব ক্রেজি এই তরুণী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
আবার অপর একটি সুত্র ধারনাপ্রসূত বলছে , দুজনের প্রেমের এক ফাঁকে ঘটনাচক্রে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের ছাত্র অমিত দাস অন্য এক তরুণীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলায় তা বৃষ্টির কানে আসায় সঙ্গতকারনে কৈফিয়ত চাওয়া নিয়ে ঐ রাতে অমিতের সাথে দ্বন্দ এবং কিছু বাক্য সহনসই না হওয়ায় আত্মহুতি দিয়ে জানিয়ে গেলেন তার অভিমানের শেষ সীমানায় মৃত্যুর মাধ্যমে প্রতীকী প্রতিবাদ।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়া কোতয়ালী মডেল থানার এসআই ছবুর খান সার্বিক আলামত দেখে এবং পোস্টমর্টেম কালে স্বয়ং নিজে উপস্থিত থেকে দেখেছে তার দেহে কোথাও যখমের চিহ্ন নেই ।
পুরাতন ভবন মঞ্জুআরা নিবাসে যে রুমে বৃষ্টি অবস্থান করতেন সেই বেডরুমটি ঘরের সম্মুখভাগে। পিছনে থাকতেন মা পূর্ণিমাসহ অপর চারবোন।  বৃষ্টির বাবা মহাদেব ঘোষ ঢাকায় একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে চাকুরীসূত্রে সেখানেই বসবাস করার পাশাপাশি মাঝে মধ্যে বরিশালে আসতেন। অভাবের সংসারে বড়বোন মনিকা ঘোষ ঘরোয়া টিউটর অর্থাৎ শিক্ষিকা হিসেবে তার উপার্জিত অর্থে পরিবারের অনটন সামাল দিতেন। এই দূর্বলতাই অমিত ও তার পরিবার পুঁজি করে বৃষ্টিকে নিয়ে প্রেমের খেলায় এপর্যন্ত নিয়ে এসেছিলো।
বড় বোন মনিকা  মঙ্গলবার ২৬ মে দুপুরে এই বরিশাল বাণীকে জানায়, উভয় পরিবার এই প্রেম সম্পর্কে অবগত। কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে টালবাহানা চলছিলো। বৃষ্টি চেয়েছিলো ৪ বছরের প্রেমের শেষ পরিণতি বিবাহে শীঘ্রই সিদ্ধান্ত গ্রহনে। সেক্ষেত্রে অমিতের ভাষ্য ছিলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোনোর পরই বৃষ্টিকে ঘরে তুলবে। এমন তথ্য মানতে নারাজ অমিতের পরিবার। তবে পুত্র অমিতের সাথে বৃষ্টির প্রেম সম্পর্ক স্বীকার করেছেন তার বাবা অমল দাস। বৃষ্টির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে ওড়নায় পেঁচিয়ে ঝুলন্ত মৃতদেহ মা পূর্ণিমা বেগম কেচি দিয়ে কেটে নিচে নামানোর পর ক্ষোভে পার্শবর্তী অমিতের বাসায় ঐ ভোরেই উপস্থিত হলে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে না দিয়ে বলা হয়, এই প্রেম তারা মেনে নেয়নি। শেষান্তে সম্পর্কও ছিলোনা।
কিন্তু প্রমান রয়েছে বৃষ্টির কোনো এক জন্মদিনে অনিকের বাসায় ডেকে তার মা মিষ্টিমুখ করান ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পুত্রবধু হিসেবে।

কন্যার মৃত্যুর খবর পেয়ে মিষ্টির বাবা ঢাকা থেকে ছুটে আসা মহাদেব ঘোষ এই বরিশাল বাণীকে জানান , আর্থিক অনটন ও ঝুট-ঝামেলা এড়াতেই ৫ মেয়েকে নিয়ে তার পরিবার অনেক নির্যাতন সহ্য করে চলছে । কিন্তু স্থানীয়রা আর্থিকভাবে শক্তিশালী অমিতের জোরের কাছে অসহায় থাকায় শেষ পর্যন্ত নিজ মেয়েকে হারাতে হলো । এখন বিচার পাওয়া নিয়েও সংশয় রয়েছে।

যদিও তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ছবুর এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, এ বিষয়ে কোনো ছাড় নেই, কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি নূরুল ইসলাম এ ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা গ্রহনে প্রস্তুত। কিন্তু বৃষ্টির পরিবার মৃত্যু পরবর্তী ধর্মীয় কিছু কার্যাদি পালনের জন্য মামলা দায়েরে আরও একদিন সময় নিতে চায় বলে জানিয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

শেয়ার করুনঃ

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

সর্বশেষ