১৪ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থাঃ —-ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে প্রতিষ্ঠিত করা। একটি উন্নত-সমৃদ্ধ-সুখী এবং সুশিক্ষায় শিক্ষিত ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। তিনি বলতেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। তাই স্বাধীনতার পর ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি মনে করতেন এবং সে কারণে ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতিকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে ৩৬ হাজার ১৬০টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ ও কর্মরত শিক্ষকদের চাকরি সরকারিকরণ করে জাতিকে অবাক করে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই, শিক্ষা উপকরণ ও খাবার বিতরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে গৃহীত খসড়া মেনিফেস্টোতে রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি নাগরিকের জন্য শিক্ষার অধিকার সমুন্নত রাখার কথা বলেছিলেন। দেশের সর্বত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করা, কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সরকারের বৃত্তি বরাদ্দের কথা উল্লেখ করেন। ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বজনীন শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালোভাবে উত্থাপিত করেন। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে ‘জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব পাকিস্তানি নাগরিকের ও শিক্ষা, ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির কথা বলেন। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষার ওপর জোর দিয়ে ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা’ কর্মসূচির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই (২৬ জুলাই) বঙ্গবন্ধু বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-ই-খুদার নেতৃত্বে বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এ ছাড়া ১৯৭৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইন প্রণয়ন করেন। ২০১০ সালে যে শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় তা ’৭২ সালের শিক্ষা কমিশনের আলোকেই। এ থেকেই বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর এদেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)’ প্রতিষ্ঠা করেন। তার জীবদ্দশায় শিক্ষা সম্পর্কিত আরও যে আইন প্রণয়ন করেছিলেন সেগুলো হলো-প্রাথমিক স্কুল অ্যাক্ট ১৯৭৪, মাদরাসা এডুকেশন অর্ডিন্যান্স ১৯৭২, বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান-আদেশ ১৯৭৩, ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ড কমিশন অব বাংলাদেশ-আদেশ ১৯৭৩ (স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশ : ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য), ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একদিকে সত্যিকার অর্থে জ্ঞান চর্চার তীর্থভূমি এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাণকেন্দ্র, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাইকে গণতান্ত্রিক মতামত রাখার সুযোগ প্রদান, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিকাশের বিষয়টি উঠে আসে।

শিক্ষাকে কোনো শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে সর্বজনীন করে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টা ছিল লক্ষণীয়। তিনি মনে করতেন শিক্ষা হবে অভিন্ন, গণমুখী ও সর্বজনীন বা সবার জন্য শিক্ষা। কেউ নিরক্ষর থাকবে না, সবাই হবে সাক্ষর। শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রী সেই লক্ষ্যেই অভিরাম কাজ করে চলেছেন। প্রতি বছর ১ জানুয়ারি বই বিতরণ, দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা, উপবৃত্তি ইত্যাদি চলছে সাফল্যের সঙ্গে। নতুন নতুন স্কুল-কলেজ-মাদরাসা প্রতিনিয়তই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে দৃষ্টিনন্দন সুউচ্চশিক্ষা ভবন দৃশ্যমান হচ্ছে।

সেখানে লেখাপড়া করছে লাখ লাখ গ্রামের শিক্ষার্থী। দেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৪.৭% এবং প্রায় ৯৯% শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। গ্রাম-শহর উভয় অঞ্চলেই বেড়েছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার হার। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশে সোনার মানুষ তৈরি করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামমন্ত্রীর নেতৃত্বে আরও যেসব যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো : শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন করে নতুন প্রজন্মকে আধুনিক মানসম্মত যুগোপযোগী শিক্ষা এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা, ভর্তি নীতিমালা বাস্তবায়ন, যথাসময়ে ক্লাস শুরু, নির্দিষ্ট দিনে পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ, ৬০ দিনে ফল প্রকাশ, সৃজনশীল পদ্ধতি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠা, তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, স্বচ্ছ গতিশীল শিক্ষা প্রশাসন গড়ে তোলা, শিক্ষার মান উন্নয়নে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া, প্রাথমিকে শিক্ষকতায় ৬০ ভাগ নারী শিক্ষক নিয়োগ করা ইত্যাদি।
প্রায় ৪০ বছর পর শিক্ষার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় ও মজবুত করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়ে জাতির পিতার মতো আরও একটি ইতিহাস রচনা করেছেন শেখ হাসিনা। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য, দেশে ৪৬টি সরকারি এবং ১০৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২৬৫টি সরকারি ও ৫৯২টি বেসরকারি কলেজে অনার্স ও মাস্টার্সের ছাত্রসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। উল্লেখ করার মতো আরও যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আছে সেগুলো হলো (কম-বেশি) ৭৭টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ৭০টি আইন কলেজ, ৪৪টি নার্সিং ইনস্টিটিউট, ২৮টি টেক্সটাইল কলেজ, ৫৪টি প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, ১৪টি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ৫৯টি এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট, ২৭টি শারীরিক শিক্ষা কলেজ ইত্যাদি। এগুলোর সিংহভাগই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক ও পরিচালক, আইআইটি,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email

শেয়ার করুনঃ

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

সর্বশেষ