১৯শে আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

আসুন আমরা একটু মানবিক হই

মুহাম্মাদ ইমাদুল হক ফিরদাউছ প্রিন্স

করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। এই মহামারি মানুষকে চিনিয়েছে তার আপন সত্ত্বা। অর্থের পিছনে পাগলের মতো ছুটতে থাকা লোকটাও আজ বুঝে গেছে নিজের ভবিষ্যৎ, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নূন্যতম কি প্রয়োজন, সুখে সাচ্ছন্দে বেঁচে থাকার জন্য আমরা যে ভাবে ছুটছি এত ছোটার প্রয়োজন নেই, জীবনে এত কিছুর প্রয়োজন নেই।

২০২০ সালের মার্চ মাস থেকেই জীবনটা থমকে গেছে ক্ষুদ্র এক ভাইরাসের কারনে। মানুষের সব দম্ভ, অহমিকা, প্রভাব প্রতিপত্তি এক নিমিষে তুচ্ছ হয়ে গেছে নোবেল করোনা ভাইরাস নামের এ অদৃশ্য শক্তির কাছে। সারা পৃথিবীকে ঘর বন্দি করে দিয়েছে এ ভাইরাস। চীনের উহান শহর থেকে সৃষ্ট ভাইরাস মানুষকে অনেক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক হিসাবে এ ভাইরাস মানব সৃষ্ট নাকি প্রকৃতি থেকে সে অন্য এক বিতর্ক। কিন্তু মানুষের অত্যাচারে জর্জরিত প্রাকৃতিক পরিবেশে ও জনজীবনের পরিবর্তন দেখে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়।

করোনা পৃথিবীকে বদলে দিবে এ চিন্তাটা তাত্ত্বিক। দুঃখজনক হল, প্রকৃতি থেকে মানুষ শিক্ষা নিতে পারেনি বলে বদলে যেতে পারছে না। মানবিকতাকে ধারণ করতে পারেনি বলে অনিয়ম আর দুর্নীতি হয়েছে বা হচ্ছে এ করোনাকালে। তাই
সমাজ আর পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে প্রতিনিয়ত আহত হচ্ছে মানুষ। এতটা বৈরী পরিবেশ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে অনুধাবন করছে একটা সত্য। বোধ করি সে সত্যটা সবার জন্য এক৷ নারী বা পুরুষ নয় বরং একজন মানুষ হিসাবে ‘আমি কিংবা আপনি অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সবকালেই একা। সেখানে নিজের একাকীত্ব দিয়েই বুঝতে হয় নিজেকে। খুঁজে নিতে হয় জীবনের আপন সত্ত্বা ও বাঁচার কারণ। মানুষের ছুটে চলা জীবনে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কগুলো অনেক বেশি যান্ত্রিক ও আলগা হয়ে গেছে আজকাল । বিশেষ করে পরিবারিক সম্পর্ক। চাওয়া পাওয়ার বাইরে যে আত্মিক একটা জীবন আছে তা মানুষ ভুলেই গেছে ।
আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে দেখতে পাচ্ছি এবং আমাদের সমাজে লক্ষ্য করছি কেহ কোন কারনে অসুস্থ হলে তার সন্তান, স্বজনরা তাকে হাসপাতালে, রাস্তায় এমনকি বাগানে ফেলে আসে। কত নিষ্ঠুর মানুষিকতার এ মানুষ নামে অমানুষগুলো। করোনা একটি ছোয়াছে রোগ হলেও এ থেকে সুরক্ষা পাওয়ারও ব্যবস্থা আছে। আমাদের মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়েসহ স্বজনরা এই মহামারীতে আক্রান্ত হতেই পারেন সেজন্য কেন তার সেবা করা যাবেনা, তার কাছে যাওয়া যাবেনা, তাকে দানবের মতো ভয় পেতে হবে? এরকম জঘন্যতম মানসিকতা পরিহার করুন। চিকিৎসকের পরামর্শে আপনার স্বজনের সেবা করুন, তাকে সাহস দিন।

আমাদের আত্বীয়-স্বজন, কলিগ এবং বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই আগে করোনা আক্রান্ত হয়ে দুই-তিন সপ্তাহ ঘরবন্দি ছিলেন। কিন্তু পরিবারের লোকজন তাদের সাথে দেখা না করে খোজ-খবর না নিয়ে দুরে থেকেছেন এরকম শুনিনি/দেখিনি বরং পরিবারের লোকজন কাছেই ছিলেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সেবা-শুশ্রূষা করেছেন। তারা সুস্থও হয়ে উঠেছেন। এতে করে পরবর্তিতে পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। আমরা জানি জন্ম-মৃত্যু মহান আল্লাহর হাতে। হায়াত শেষ হয়ে গেলে এক মিনিটও আমরা বাঁচব না, কাউকে বাঁচাতেও পারব না। মরতে পারি আকাশে। মরতে পারি পানিতে কিংবা সড়কে । কিন্তু মানুষ হিসেবে মৃত্যুর আগেআত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ন্যূনতম সাক্ষাৎ তো পাওয়ার অধিকার আছে।

যারা আজ করোনার ভয়ে করোনা আক্রান্ত অসুস্থ আত্বীয়র কাছে যাচ্ছেননা, সেবা করছেননা, তার কাছ থেকে দুরে থাকছেন; তারা যে কতটুকু অমানবিক কাজ করছেন সেই উপলব্ধিটুকুও কি মারা গেছে? আপনি যদি আজ অসুস্থ হন, আর আপনার যদি শ্বাসকষ্ট হয়, আপনার যদি অক্সিজেনের/আইসিইউর দরকার হয় তখন আপনার সন্তান, ভাই, বোন, স্বামী-স্ত্রী আপনার কাছে না আসে, আপনার সাথে কুশল বিনিময় না করে, তাহলে তখন আপনার অনুভূতি কেমন হবে? একবার অন্যের কষ্টের কথাটি উপলব্ধি করলে বোধহয় আপনার চৈতন্য ফিরে পাবেন। আপনারা করোনার ভয়ে নিজের অসুস্থ আপনজনকে দুরে রেখে সেবা শুস্রসা করছেননা, মহান আল্লাহর কাছে আপনারা কী জবাব দেবেন? আপনাদের ভয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আপনারা মনে করছেন করোনা উপসর্গের কোনো ব্যক্তিকে দূর থেকে দেখলেও করোনা উড়ে এসে আপনার শরীরে বাসা বাঁধতে পারে। মনে রাখবেন নিজে নিরাপদ দূরত্বে থেকে করোনা আক্রান্ত আপনজনের সেবা করা কোন সমস্যাইনা। এরকম সেবা করে আক্রান্ত হননি লাখো লাখো দৃষ্টান্ত আছে। আর করোনা রোগীদের কাছে না গিয়েও করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এরকম লাখো দৃষ্টান্ত আছে।

ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি বা তার পরিবারের কষ্ট কাছ থেকে যারা দেখার সুযোগ পেয়েছেন তারা বাদে অন্যদের হয় না। অন্যদিকে নিজে আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত কষ্টটা কেউ অনুধাবন করতে পারে না। আপনজনের স্বাভাবিক মৃত্যুতেও মানুষ শোকাতুর হয় কিন্তু পরিবারের কোন সদস্য করোনা আক্রান্ত হলে যে কতটা অসহায় হয়ে পড়ে তার কষ্টটা অসীম, ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। করোনা আক্রান্ত হয়ে অসহায় হয়ে না পড়লে কেউ বুঝতে পারে না অসহায়ত্ব আসলে কী! আর এইযে সবকিছু একজন/দুজনে সামলানো, এটাই অসহায়ত্ব। সমুদ্রের পানিতে ভেসে থেকেও খাবার পানি না পাওয়ার মত অসহায়ত্ব!
সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে প্রিয়জনের শ্বাসকষ্টের দৃশ্য দেখা। এটা সহ্য করার মতো নয়। শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া ব্যক্তিটি যখন আপনার চোখের সামনে তখন এর চেয়ে কষ্টের, অসহায়ত্বের দৃশ্য পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আছে বলে মনে হয় না। আপনার অসুস্থ প্রিয়জন হয়ত আপনার চেহারাটা দেখতে চাইতে পারেন তখন যদি আপনাকে দেখতে না পারেন তখন তার কেমন অনুভব হবে? এমন অবস্থায় না পরলে কারও দ্বারা বোঝা সম্ভব নয়।

তাই আসুন, আমরা একটু মানবিক হই। করোনার ভয়ে পালিয়ে বেড়ালেই কি আমরা করোনা থেকে বাঁচতে পারব? আমরা আপনজনের প্রতি নিষ্ঠুর না হয়ে মানবিক হলে মহান আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিনও আমাদের ওপর মানবিক হবেন।

✒️লেখকঃ- কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী।

Print Friendly, PDF & Email

শেয়ার করুনঃ

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

সর্বশেষ