১৯শে আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

পঁচাত্তরের থিংকট্যাংকের আর একটি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলো

আলম রায়হানঃ টক অব দ্য কান্ট্রি হয়ে গিয়েছিল ১৮ আগস্ট রাতে বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর সদর উপজেলা কমপ্লেক্সে ইউএনওর নির্দেশে আনসার সদস্যদের গুলিবর্ষণ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে করা হয়েছিল। চায়ের কাপে ঝড় তোলার মতো। এই ঘটনার পেছনে স্থানীয় রাজনীতির বিরোধকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হলেও নেপথ্যে ছিল পঁচাত্তরের থিংকট্যাংকের কারসাজি। কিন্তু শেষতক সরকারের দৃঢ়তা এবং স্থানীয় রাজনীতিকদের সহনশীলতা ও বিভাগীয় কমিশনার মো. সাইফুল হাসান বাদলের বিচক্ষণতায় বড় ধরনের অঘটনের দোরগোড়া থেকে ফিরে এসেছে দেশ। ২২ আগস্ট বিভাগীয় কমিশনারের বাসভবনে ‘সমঝোতা বৈঠকে’ এসেছে স্বস্তি। এ বৈঠক মাইলফলক হয়েই থাকবে। কিন্তু এরপরও থেকে গেছে বেশ কিছু প্রশ্ন ও আশঙ্কা।

বরিশাল শহরের বিভিন্ন এলাকার নানান ধরনের ব্যানার-বিলবোর্ড অপসারণের অংশ হিসেবে ১৮ আগস্ট রাত সাড়ে আটটার দিকে সদর উপজেলা কমপ্লেক্সে পরিচ্ছন্নতা কাজ শুরু করে বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। এসময় তারা বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু তারা জানে না নেপথ্য ঘটনা। কিন্তু ইউএনও মুনিবুর রহমানের না জানার কথা তো নয়। এরপরও তিনি বেরিয়ে এলেন। যেন তিনিই কমপ্লেক্সের কেয়ারটেকার অথবা ফাটা কেস্ট! এক পর্যায়ে তিনি কর্তব্যরত আনসারদের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আদেশ পেয়ে আনসার সদস্যরা মারমুখী হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের রক্ষায় সরকারি দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা এগিয়ে আসেন। এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, পরিচ্ছন্নতাকর্র্মীরা এখন কিন্তু আগের মতো জনবিচ্ছিন্ন নন। ফলে তাদের ওপর হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি অধিকতর ঘোলাটে হয়ে যায়।

অঘটনের খবর পেয়ে বিসিসি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছান। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে সকলকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। এরপরও আনসার বাহিনী গুলি চালিয়েছে। শুরু থেকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিক খালিদ সাইফুল্লা ও কাজী হাফিজ জানিয়েছেন, অন্তত তিন দফা গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এদিকে নানান সূত্রে জানা গেছে, এসব গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কেবলমাত্র নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসারদের দিক থেকে। একই রকম কথা বলেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ৭১ টেলিভিশনের বরিশাল প্রতিনিধি বিধান সরকার। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘১৮ আগস্ট রাতে গুলি হয়েছে, গোলাগুলি হয়নি।’ একটি সূত্র বলছে, সেদিন আসলে গোলাগুলি ঘটানোর জন্য ফাঁদ পাতা হয়েছিল। কিন্তু মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ কিনারে গেলেও সেই ফাঁদে পা দেননি। তিনি আবার প্রমাণ করেছেন, যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়েও রাজনীতিকদের কখনো কখনো ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়।

বরিশালের উল্লেখিত ঘটনার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কয়েকজন মন্ত্রী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, বরিশালের ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক, তাদেরকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। এদিকে বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে।

ঘটনার বিস্তার এখানেই থেমে যেতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। বরং অভূতপূর্ব ‘কড়া’ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। এদিকে এ ক্যাডারের সদস্য জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দীন হায়দার বরিশাল শহরে দশ প্লাটুন বিজিবি চেয়ে পত্র দিয়েছিলেন। এখানেই শেষ নয়। বিসিসি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহকে প্রধান আসামি করে দুটি মামলায় আসামি করা হয়েছে। হয়েছে পাল্টা মামলাও।

বরিশালের ঘটনায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া অনেকের কাছেই মনে হয়েছে আক্রমণাত্মক ও রহস্যজনক। ভুলেভরা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের আইনের মাধ্যমেই মোকাবিলা করা হবে।’ বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানায় অ্যাসোসিয়েশন। এ সংগঠনের সভাপতি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী সাবেক সেনা কর্মকর্তা বরিশাল সদর আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য কর্নেল জাহিদ ফারুক শামীম। প্রতিমন্ত্রী-মেয়র বিরোধ আছে বলে বরিশালে রটনা আছে। এটিকে ঘটনা হিসেবেও মনে করেন অনেকেই।

বরিশালের ঘটনার পরদিন ১৯ আগস্ট সন্ধ্যায় অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কবির বিন আনোয়ারের সভাপতিত্বে সংগঠনের কার্যনির্বাহী পরিষদের জরুরি সভা হয়। পরে রাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে সংঘটিত ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হয়, আইনের মাধ্যমেই দুর্বৃত্তদের মোকাবিলা করা হবে এবং আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।’ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ‘বরিশালের ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায় সরকারি কর্তব্য পালন করতে গিয়ে ইউএনও কীভাবে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের দ্বারা হেনস্তা হয়েছেন। তার বাসায় হামলা করা হয়, যেখানে তার করোনা আক্রান্ত অসুস্থ পিতা-মাতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে এই কর্মকর্তাকে গালাগাল করা হয়েছে। তার বাড়ির ফটক ভেঙে প্রবেশ করা হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি ব্যবহার করা হয়েছে। তার চামড়া তুলে নেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে স্লোগান দিয়ে মিছিল করা হয়েছে। মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ও তার দুর্বৃত্ত বাহিনী সিটি করপোরেশনের কর্মচারীদের দিয়ে নানা প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং পুরো জেলায় ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করেছেন।’ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এই সংগঠনের পক্ষ থেকে উল্লেখিত বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অত্যন্ত আস্থাবান এবং তার লালিত দেশপ্রেমের চেতনা ধারণ করে কাজ করছেন।’ অ্যাসোসিয়েশন বলছে, তারা কর্তব্য পালনে সচেষ্ট থাকবেন। আইনের শাসনের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর যে অভিপ্রায়, সে ব্যাপারে তারা সবাই অঙ্গীকারবদ্ধ। কোনো পরিস্থিতিতেই তারা সেই পথ থেকে বিচ্যুত হবেন না।’

প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের উল্লেখিত সংগঠনটি এ ধরনের বাক্য এবং শব্দ প্রয়োগে প্রেস রিলিজ দিতে পারে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন! অনেকেই মনে করেন, সীমার বাইরে গিয়ে অনেকটা সংবিধান বহির্ভূতভাবে এ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। এদিকে কাগজে-কলমে যাই বলা হোক, জনগণের প্রতি সচিবদের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু রয়েই গেছে। অতীতে অনেক উদাহরণ আছে, আমলারা জনগণ তো দূরের কথা, সরকারের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা, বিশ্বস্ততা ভঙ্গ করার একাধিক উদাহরণ আছে। এর মধ্যে বেশ আলোচিত হয়ে আছে উত্তরা ষড়যন্ত্র হিসেবে পরিচিত আমলাদের এক অংশের একটি বৈঠক। আমলারা সুবিধা বুঝে কেবলা বদল করে, এবং সব সময়ই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে- এটি স্বীকৃত সত্য। কাজেই অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের রহস্যজনক ভাষায় বিবৃতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েই থাকলো। পাশাপাশি আর একটি প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেটি হলো, কোন বিবেচনায় জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দীন হায়দার বরিশালে দশ প্লাটুন বিজিবি চেয়ে বসলেন!

বরিশালে এমন কি কিছু ঘটেছিল যে, বিজিবি নামাতে হবে! বরং সবারই জানা, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ সর্বোচ্চ দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে একাধিকবার। এমনকি ১৮ আগস্টের ঘটনার মোকাবিলা করে সক্ষমতার স্পষ্ট স্বাক্ষর রেখেছে বরিশাল মেট্রোপলিটান পুলিশ (বিএমপি।) এরপরও সুদর্শন জেলা প্রশাসক ১০ ম্যাজিস্ট্রেট ও ১০ প্লাটুন বিজিবি চাইলেন কোন বিবেচনায়? তিনি কি একবারও ভেবে দেখেছেন, এ খবরে নগরীতে কতটা আতঙ্ক ছড়িয়েছে? শুধু তাই নয়, সরকারবিরোধী শক্তি অধিকতর সক্রিয় হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদেরকে করেছে বিক্ষুব্ধ। তবে স্বস্তির খবর হচ্ছে, জেলা প্রশাসকের অনুরোধে সাড়া দেয়নি বিচক্ষণ সরকার। এরপরও এ নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করেছেন বিভাগীয় কমিশনার মো. সাইফুল হাসান বাদল। তিনি বিজিবি মোতায়েন না করার বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার পর বরিশাল শহরের গুমোট ভাব কেটেছে। বিভাগীয় কমিশনারের এক উচ্চারণে শহরে আতঙ্কের পারদ শূন্যে নেমে গেছে।

আমার মনে হয়, প্রশাসনসহ সরকারি চাকরিরত সকলকেই আরো বিনয়ী ও কৌশলী হওয়া প্রয়োজন। আর সাথে সাথে সবসময় মনে রাখা প্রয়োজন, যে মাত্রায়ই হোক জনপ্রতিনিধিদেরকে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেই হয়। পানি ছাড়া মাছ যেমন, তেমনই জনগণ ছাড়া জনপ্রতিনিধি অকল্পনীয়। বলাই বাহুল্য, চূড়ান্ত বিচারে রাজনীতিবিদরাই রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, আমলারা নন। সেটি বরিশালের ঘটনায় আবার প্রমাণিত হলো। মেয়র সাদিকের বিষয়টি সেভাবেই দেখা প্রয়োজন।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Print Friendly, PDF & Email

শেয়ার করুনঃ

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

সর্বশেষ