১৫ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
নলছিটিতে কৃষককে মারধরের অভিযোগ বরিশাল বাণী’র উপ-সম্পাদক হলেন জুবাইয়া বিন্তে কবির প্রশাসনের নীরব ভূমিকা সড়কের ওপর বাজার, দীর্ঘ যানজটে মানুষের ভোগান্তি ভোলায় মহাসড়কে আওয়ামী লীগ নেতার গরুর হাট লালমোহনে মোবাইলে ডেকে বাড়িতে নিয়ে কিশোরীকে গণধ*র্ষ*ণ করল প্রেমিক ও তার বন্ধু ঈদ যাত্রা নিরাপদ করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে-- সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী একজন মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা মোঃ মাসুদ রানা লায়ন মো: গনি মিয়া বাবুল বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জাগ্রতপ্রাণ আগামীকাল বরিশালে আসছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম এমপি ভোলায় অতিরিক্ত যাত্রী বহন: ২ লঞ্চ ও ইজারাদারকে জরিমানা

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ স্মরণে

শেয়ার করুনঃ

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email

“মুহম্মদ আলতাফ হোসেন”

(১৮ই আগস্ট মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর ৫৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ)

সুসাহিতিহ্যক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, চিন্তাবিদ, সমাজ সংস্কারক মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসের এক কিংবদন্তীর নায়ক। বহুমূখী প্রতিভা ও দুর্লভ ব্যক্তিত্বের অধিকারী আকরম খাঁর জন্ম ১৮৬৯ সালের ৭ই জুন পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাট মহকুমার হাকিমপুর গ্রামে। ১৯৬৮ সালের ১৮ই আগস্ট তিনি ৯৯ বছর বয়সে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন । তাঁর বংশের রয়েছে এক বর্ণালী ঐতিহ্য। মোহাম্মদ আকরম খাঁ’র পূর্ব পুরুষগণ ছিলেন পীরালী ব্রাহ্মণ। পঞ্চদশ শতকে বাগেরহাটের শাসনকর্তা খানজাহান আলীর সময় তারা ইসলামী জীবন দর্শনে মুগ্ধ হয়ে ধর্মান্তরিত হন। পিতামহ তোরাব আলী খাঁ সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীরের সহযোদ্ধা হয়ে বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। পিতা আবদুল বারী খাঁ সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভীর নেতৃত্বে বালাকোট প্রান্তরে শিখ ও ইংরেজ বিরোধী সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। পিতা ও পিতামহের এই বিপ্লবী রক্ত আকরম খাঁ’র ধমনীতে প্রবাহিত হয়। তার ১ বছর বয়সে ১৮৭০ সালে মাতা পিতা উভয়ে একদিনে কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। জীবনের এই মহা ট্রাজেডিও তাঁকে কাবু করতে পারেনি।
১৯০০ সালে কলকাতা মাদ্রাসা থেকে এফ.এম. পাশ করার পর তিনি কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। সাংবাদিকতাকেই তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। সাংবাদিকতা ক্ষেত্রে তিনি নিজেই একটি ইনষ্টিটিউট। তাঁকে বলা হয় মুসলিম বাংলা সাংবাদিকতার জনক ও পথিকৃৎ। মাসিক মোহাম্মদী, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী, দৈনিক মোহাম্মদী, মাসিক আল এসলাম, উর্দু দৈনিক জামানা, সাপ্তাহিক সেবক, দৈনিক সেবক, দৈনিক আজাদ পত্রিকা তাঁর কর্মপ্রচেষ্টার ফসল। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে এবং মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় এসব পত্রিকা কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বঞ্চিত, শোষিত, অবহেলিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত ও পশ্চাদপদ মুসলিম সমাজের উন্নতি অগ্রগতির চিন্তায় আকরম খাঁ ছিলেন সদা বিভোর। ইংরেজ শাসক গোষ্ঠীর দ্বিমুখী নীতি এবং প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের বৈরী আচরণে মুসলমানরা ছিল বিপর্যস্ত। মুসলমানদের এ ঘোর দুর্দিনে আকরম খাঁ সিপাহসালারের ভূমিকা পালন করেন। মুসলমানদের অধিকার, তাদের অসুবিধা ও সমস্যাবলী সরকারের গোচরীভূত করার জন্য তিনি মসীযুদ্ধ চালান। রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ সকল ক্ষেত্রেই তৎকালে মুসলমানরা ছিল পশ্চাদপদ। পরাধীন ভারতে তারা ছিল চরম অসহায়। হিন্দুদের কাছে তারা ছিল মুচলমানের ব্যাটা, চাষা, মোল্লা, ম্লেচ্ছ, যবন, অসুর। আর বৃটিশ সরকারের কাছে ছিল ‘বিদ্রোহী যুদ্ধাপরাধী। সেই প্রেক্ষিতে ‘মুসলামন’ হওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় অপরাধ। বাবু, ভদ্রলোক বলতে বুঝানো হত হিন্দুদের। আর তাদের কাছে মুসলমানরা ছিল নিকৃষ্ট, অধম জীবতুল্য। আর হিন্দুদের প্রধান পত্রিকা আনন্দবাজার, বসুমতী, প্রবাসী সর্বদাই মুসলিম বিরোধী প্রচারণায় লিপ্ত থাকত। আকরম খাঁ’র সাপ্তাহিক মোহাম্মদী এর উপযুক্ত জবাব দিত। সাপ্তাহিক মোহাম্মদী এজন্য বাংলা, আসাম ও বার্মার মুসলমানদের ছিল জনপ্রিয় পত্রিকা। শহর, বন্দর ছাড়িয়ে মফঃস্বল এলাকায়ও এর চাহিদা ছিল তুঙ্গে। সাপ্তাহিক ও মাসিক মোহাম্মদী বহু তরুণকে সাংবাদিকতা পেশায় উদ্বুদ্ধ করে। যারা পরবর্তীকালে বড় সাংবাদিক, লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ১৯২১-২২ সালে আকরম খাঁ সাংবাদিকতা পেশার জন্য জেল খাটেন। ১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে দৈনিক সেবকে ‘অগ্রসর! অগ্রসর!’ শিরোনামে বিদ্রোহাত্মক সম্পাদকীয় লেখার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১০ ডিসেম্বর কলকাতার তৎকালীন প্রেসিডেন্সী ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ সুইনহোর বিচারের প্রহসনে তাকে এক বছর কারাদন্ডে দন্ডিত করেন। সেবকের জামানত বাতিল করে সরকার। সেবকের উপর সরকারী নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলে সাপ্তাহিক মোহাম্মদীকে দৈনিকে রূপান্তরিত করা হয়। কাজী নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, মুজীবুর রহমান খাঁ, মঈনউদ্দিন হুসায়ন প্রমুখ দৈনিক মোহাম্মদীতে কাজ করতেন।
১৯২৭ সালের ৬ নভেম্বর মুসলিম নবজাগরণের কন্ঠস্বর হিসেবে মাসিক মোহাম্মদী দ্বিতীয় পর্যায় আত্মপ্রকাশ করে। বহুযুগ ধরে পুঞ্জিভূত মুসলিম সমাজের কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামী দূরীকরণ এবং ইসলামী মূল্যবোধের বিকাশে মাসিক মোহাম্মদী ছিল প্রধান নিয়ামক। প্রথমে আকরম খাঁ’র বড় ছেলে খায়রুল আনাম খাঁ ও পরবর্তীতে আবুল কালাম শামসুদ্দীন মাসিক মোহাম্মদীর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। কলকাতার প্রবাসী ও ঢাকার শিখা ছিল এ সময় মাসিক মোহাম্মদীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এ সময় ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বঙ্গিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম গ্রহণ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম শ্রীপদ্মকে কেন্দ্র করে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন সংগঠিত হয়। মাসিক মোহাম্মদী মুসলমানদের পক্ষাবলম্বন করে প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশ করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান ছাত্রদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং মুসলমান ছাত্রদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের স্বরূপ উন্মোচনের লক্ষ্যে মোহাম্মদী একটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। ছাত্রদের আন্দোলন ও মাসিক মোহাম্মদীর যুগান্তকারী ভূমিকায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শ্রী বাদ দিতে বাধ্য হয়। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আকরম খাঁ’র শ্রেষ্ঠ কীর্তি দৈনিক আজাদ। ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোরব কলকাতা থেকে এটি প্রকাশিত হয়। ১৯৩৬-৪০ সাল পর্যন্ত নিজে এবং ১৯৪০-৬২ পর্যন্ত আবুল কালাম শামসুদ্দীন অধুনালুপ্ত দৈনিক আজাদের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উপমহাদেশের আযাদী আন্দোলন, মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি নির্মাণ এবং মুসলিম লীগের আদর্শ প্রচারে দৈনিক আজাদ প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে।
সাহিত্যিক হিসেবেও তিনি ছিলেন নন্দিত, আলোচিত। তার অমূল্য কীর্তি মোস্তফা চরিত এবং মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস। এছাড়া যীশু কি নিষ্পাপ, এসলাম মিশন, মোস্তফা চরিত্রের বৈশিষ্ট্য, উম্মুল কেতাব, বাইবেলের নির্দেশ ও প্রচলিত খৃষ্টান ধর্ম, মুক্তি ও ইসলাম, তফসীরুল কোরআন ১ম-৫ম খন্ড, মিশ্র ও স্বতন্ত্র নির্বাচন, সমস্যা ও সমাধান, এছলামের রাজ্য শাসন বিধান প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য রচনা। এসব গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি ইসলামের মর্মবাণী এবং বিপ্লবী আদর্শ জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। ক্ষুরধার লেখনী ও যুক্তিতর্কের সাহায্যে খৃষ্টান পাদ্রীদের অপপ্রচারের জবাব দিয়েছেন।
রাজনৈতিক ময়দানেও ছিল আকরম খাঁ’র সক্রিয় পদচারণা। ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেসের একজন সমর্থক হিসেবে রাজনৈতিক জীবনের যাত্রা শুরু। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা হলে এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯১৮-২৪ সালে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯২২ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট প্রণয়নে সহযোগিতা দেন। ১৯২৬ সালে বেঙ্গল কংগ্রেসের সভাপতি মনোনীত হন। ১৯২৭ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। ১৯৩৪-৪৭ মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য এবং ১৯৪৭-৫১ প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালের ১৮ আগস্ট প্রায় শত বছর বয়সে এই মহীরুহের জীবনাবসান ঘটে। তার মৃত্যুতে দেশে বিদেশে বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গ ও শিক্ষিত সমাজ শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। ভারতের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় তার মৃত্যু সংবাদে।
আকরম খাঁ ছিলেন বাংলার ইতিহাসের প্রাজ্ঞ মনীষীদের একজন। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, ‘মাওলানা আরকম খাঁ একটি ব্যক্তিমাত্র ছিলেন না। অন্যান্য অনেক নেতার মত তিনি শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানও ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি যুগের প্রতিনিধি-যুগের প্রতীক। স্বয়ং একটি যুগ। বাহির হতে তার ব্যক্তিত্বের বিরাটত্ব; তার সাফল্যের বিপুলতা, তার প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের বিস্তৃতি দেখিলে বলিতেই হইবে তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। মাওলানা সাহেবের বিরাট ব্যক্তিত্বরূপী সে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিন্তানায়ক ও সমাজ সংস্কারকের শ্রেষ্ঠ মহৎ গুণাবলীর সমাবেশ ঘটিয়াছিল অপূর্ব সামঞ্জস্যে। তিনি একাধারে ছিলেন সবই। সকল অমৃত ফলের ছিলেন তিনি কল্পতরু। আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ আজ থেকে ৫৫ বছর পূর্বে চিরবিদায় নিয়েছেন। অথচ এই দীর্ঘ সময়েও তার জীবন ও র্কীতিকে ধরে রাখতে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
লেখক ঃ মুহম্মদ আলতাফ হোসেন, প্রবীণ সাংবাদিক, লেখক ও কলামিষ্ট।

সর্বশেষ